দিদার পাঁচ মিনিটের ভোলা স্মৃতি
কিছু মানুষ গল্প হয়ে যায়, কিন্তু তাদের ভালোবাসা কখনো ভোলা যায় না।
দিদার পাঁচ মিনিটের ভোলা স্মৃতি

আমার দিদা—আমরা সবাই তাকে “দিদা” বলেই ডাকতাম—ছিলেন আমাদের পরিবারের সবচেয়ে শান্ত, স্নেহময় এবং আশ্চর্য মানুষ। কিন্তু তাঁর একটি অদ্ভুত স্বভাব ছিল: তিনি পাঁচ মিনিট আগের কথাও ভুলে যেতেন। ছোটবেলায় বিষয়টি আমাদের কাছে মজার লাগত, পরে বুঝেছি—এই ভোলাভাবের ভেতরেও ছিল ভালোবাসার গভীর গল্প।
১. চশমা খোঁজার গল্প
একদিন সকালবেলা দিদা হঠাৎ চিৎকার করে বললেন,
“আমার চশমাটা কে নিল? আমি তো এখানেই রেখেছিলাম!”
আমরা সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। টেবিল, আলমারি, রান্নাঘর, সব জায়গা তন্নতন্ন করে দেখা হলো। পাঁচ মিনিট পর আমি দেখি দিদা মাথার ওপর হাত বুলাচ্ছেন।
“আরে, আমার চশমা তো মাথায়!”
আমরা সবাই হেসে উঠলাম। দিদাও হাসলেন, যেন এই ঘটনাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে মজার মুহূর্ত।
২. একই গল্প বারবার
দিদা গল্প বলতে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা ছিল—একই গল্প তিনি দিনে দশবার বলতেন, আর প্রতিবারই মনে করতেন, এই প্রথম বলছেন।
“শুনেছিস, তোর দাদু আমাকে বিয়ের সময় লাল শাড়ি কিনে দিয়েছিল…”
আমি বলতাম, “হ্যাঁ দিদা, শুনেছি।”
পাঁচ মিনিট পর আবার—
“শুনেছিস, তোর দাদু…”
আমরা কখনো বিরক্ত হতাম না। কারণ প্রতিবার গল্প বলার সময় তাঁর চোখে যে ভালোবাসা আর লজ্জার হাসি ফুটে উঠত, তা ছিল নতুনের মতোই।
৩. চায়ের কাপে ভুল
একদিন তিনি আমাকে বললেন,
“বাবা, আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দে।”
আমি চা বানিয়ে দিলাম। তিনি ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে বললেন,
“খুব ভালো হয়েছে।”
পাঁচ মিনিট পর আবার বললেন,
“আজ কেউ আমাকে চা দিল না কেন?”
আমি হেসে বললাম, “দিদা, আপনি তো এখনই চা খেলেন।”
তিনি অবাক হয়ে কাপের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ও তাই নাকি! তা হলে আরেক কাপ বানিয়ে দে, এইটা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে!”
৪. ভুলে যাওয়া রাগ
দিদার আরেকটি মজার দিক ছিল—তিনি রাগ করতেন, কিন্তু পাঁচ মিনিটের বেশি তা মনে রাখতে পারতেন না।
একদিন আমি ভুল করে তাঁর গাছের টব ভেঙে ফেললাম। তিনি খুব রেগে বললেন,
“তুই সব নষ্ট করে ফেলিস!”
আমি ভয়ে চুপ করে রইলাম। পাঁচ মিনিট পর তিনি আমাকে ডেকে বললেন,
“কী রে, মন খারাপ কেন? চল, তোকে নারকেল নাড়ু খাওয়াই।”
আমি বুঝলাম—তিনি রাগটাও ভুলে গেছেন।
৫. ভুলে যাওয়ার আড়ালে ভালোবাসা
সময়ের সঙ্গে আমরা বুঝতে পারলাম, দিদার এই ভোলা স্বভাব কোনো দুর্বলতা নয়—এ যেন এক আশীর্বাদ। তিনি কষ্ট ভুলে যেতেন, রাগ ভুলে যেতেন, দুঃখ ভুলে যেতেন। তাই তাঁর মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকত।
একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,
“দিদা, তুমি এত কিছু ভুলে যাও, খারাপ লাগে না?”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“খারাপ কথা মনে রাখলে মন ভারী হয়। আল্লাহ আমাকে দয়া করে ভুলিয়ে দেন, তাই আমি হালকা থাকি।”
৬. শেষ স্মৃতি
দিদা এখন আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সেই পাঁচ মিনিটের ভোলা স্মৃতি আজও আমাদের মনে অমলিন। আমরা যখন কোনো কষ্টে ডুবে যাই, তখন দিদার কথাটা মনে পড়ে—
“খারাপ কথা ভুলে গেলে মন হালকা থাকে।”
আজও বাড়ির উঠোনে বসে চা খেতে খেতে মনে হয়, দিদা হয়তো পাশেই বসে বলছেন—
“আমাকে কি কেউ চা দেবে?”
আর আমরা সবাই হেসে উঠি, চোখের কোণে জল নিয়ে।
উপসংহার
দিদা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—স্মৃতি শুধু মনে রাখার বিষয় নয়, ভুলে যাওয়ার মধ্যেও আছে শান্তি। তাঁর পাঁচ মিনিটের ভোলা মন আমাদের জীবনের দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা হয়ে আছে।
কিছু মানুষ গল্প হয়ে যায়, কিন্তু তাদের ভালোবাসা কখনো ভোলা যায় না।



