From my Childhood Memoryবাংলা ব্লগ

বাবার সাথে গ্রামের বাজারে

"সেই দিন কি ফিরে আসবে?"

ছোটবেলায় আমার সবচেয়ে প্রিয় দিন ছিল হাটবার। ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি, পূর্ব আকাশে লালচে আভা। বাবা গামছা কাঁধে নিতেন, হাতে বাঁশের তৈরি ঝুড়ি আর কয়েকটি ছোট মাদুর, কুলো, চালনি সব নিজের হাতে বানানো। কখনও আবার আমাদের বাড়ির ছোট সবজিখেতের লাউ, কুমড়া, বেগুন, শাকপাতা নিয়ে বের হতাম। তিন কিলোমিটার পথ, মাঠের আল, খালের ধারে সরু বাঁধ, কখনও কাঁদামাটি, কখনও ধুলোমাখা কাঁচা রাস্তা, হেঁটে যেতে হত গ্রামের বাজারে। 

আমি বাবার আঙুল শক্ত করে ধরে হাঁটতাম। মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠলে বাবা বলতেন,

আর একটু পথ, দেখবি বাজারের কোলাহল শোনা যাচ্ছে।

সত্যিই, কিছুদূর গেলেই ভেসে আসত মানুষের গলার আওয়াজ, গরুর ডাক, হাঁসমুরগির ডানা ঝাপটানোর শব্দ।

বাজারে পৌঁছালে মনে হত যেন অন্য এক জগৎ। কাঁচা মাটির উপর সারি সারি দোকান। কেউ মাছ সাজাচ্ছে, কেউ মাটির হাঁড়িপাতিল, কেউ কাপড়। বাবা আমাদের ঝুড়ি নামিয়ে বসতেন এক কোণে। বাঁশের কুলো, চালনি, ডালা, সব সুন্দর করে সাজাতেন। সবজিগুলো ধুয়ে চকচকে করে রাখতেন। ক্রেতারা এসে দাম জিজ্ঞেস করত, কেউ কমাতে চাইত, কেউ প্রশংসা করত: “ভাই, আপনার হাতের কাজ তো বেশ মজবুত!”

বাবা হেসে বলতেন, “নিজের হাতে বানাইছি, টিকবেই।

কখনও সবজি দ্রুত বিক্রি হয়ে যেত, কখনও বসে থাকতে হত দুপুর পর্যন্ত। রোদ যখন মাথার উপর, তখন আমি একটু অস্থির হয়ে পড়তাম। বাবা গামছা দিয়ে আমার ঘাম মুছে দিতেন। বলতেন, “ধৈর্য ধরতে শেখ, জীবনও বাজারের মতো, কখনও দ্রুত বিক্রি, কখনও অপেক্ষা।

সব বিক্রি হয়ে গেলে শুরু হত কেনাকাটা। আমরা হাঁটতাম চালের দোকানে। বাবা মেপে নিতেন দুতিন কেজি চাল। তারপর ডাল, লবণ, সরিষার তেল। কখনও ছোট মাছ, টেংরা বা পুঁটি। হিসাব করে খরচ করতেন। কয়েনগুলো গুনতেন খুব যত্নে, যেন প্রতিটি পয়সার আলাদা মূল্য।

আমি তাকিয়ে থাকতাম পাশের মিষ্টির দোকানে। গরম জিলাপির গন্ধ ভেসে আসত। বাবা বুঝতেন। সব হিসাব মেলানোর পর যদি কয়েকটা টাকা বাঁচত, তিনি বলতেন, “চল, আজকে তোর জন্য কিছু নেওয়া যাক।

একটা গরম জিলাপি, কিংবা দুটো বাতাসা, কখনও ছোট প্যাকেট চানাচুর, সেই সামান্য খাবারই ছিল আমার কাছে স্বর্গের সুখ। আমরা বাজারের এক কোণে বসে খেতাম। বাবা নিজের ভাগটা আমাকে দিতেন, আমি অর্ধেক জোর করে তার মুখে তুলে দিতাম।

তখন অভাব ছিল। আমাদেরই নয়, প্রায় সবার ঘরে। কারও টিনের চালা ফুটো, কারও ধানের গোলা ফাঁকা। তবু মানুষে মানুষে এক অদ্ভুত বন্ধন ছিল। বাজারে সবাই সবার খোঁজ নিত, চাচা, আপনার ছেলে কেমন আছে?” “খালা, আপনার শরীর ভালো তো?”

ঋণ নিলে লজ্জা ছিল, কিন্তু বিশ্বাসও ছিল।মাসের শেষে দিয়ে দেওয়া হবেএই কথার দাম ছিল।

হানাহানি, মারামারি খুব কম দেখেছি। মতভেদ ছিল, কিন্তু শত্রুতা কম। ঈদের আগে হিন্দু প্রতিবেশী এসে সেমাই খেত, পূজার সময় আমরা প্রসাদ নিতে যেতাম। বাজার ছিল শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল মিলনের জায়গা।

বিকেলে ফেরার সময় তিন কিলোমিটার পথ যেন আর কষ্টকর লাগত না। ঝুড়িতে চালডাল, হাতে তেলের বোতল, আর আমার মুখে জিলাপির মিষ্টি স্বাদ। সূর্য ডুবে গেলে আকাশে লালচে আলো ছড়িয়ে পড়ত। বাবা ক্লান্ত হলেও মুখে তৃপ্তির হাসি থাকত। বলতেন, “আজকের দিনটা ভালো গেল।

আমি ভাবতাম, ভালো দিন মানে কি? এখন বুঝি, ভালো দিন মানে ছিল পরিশ্রমের পর শান্তি, অল্পের মধ্যে তৃপ্তি, মানুষের মধ্যে বিশ্বাস।

আজ যখন আধুনিক বাজারে যাই, পাকা দালান, রঙিন আলো, প্লাস্টিকের ব্যাগ, মোবাইলের হিসাবনিকাশ, সবকিছু অনেক সহজ। হাঁটতে হয় না, গাড়ি আছে। চালডাল একসাথে ট্রলিতে তুলে বিল দিয়ে বের হয়ে আসা যায়। কিন্তু কোথায় যেন সেই উষ্ণতা হারিয়ে গেছে। কেউ কাউকে চেনে না, কথা বলে না। সম্পর্কগুলো যেন হিসাবের খাতায় বন্দি।

মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, “সেই দিন কি আর আসবে?”

সম্ভবত সময়কে পিছিয়ে নেওয়া যায় না। তিন কিলোমিটার কাঁচা পথ, বাঁশের কুলো, গরম জিলাপি, সবই এখন স্মৃতির পাতায়। কিন্তু হয়তো সেই দিনের মূল শিক্ষা ফিরিয়ে আনা যায়। অল্পে সন্তুষ্ট থাকা, পরিশ্রমকে সম্মান করা, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা, এগুলো তো আজও সম্ভব।

বাবা এখন নাই। গ্রামের সমাজেও আগের মতো নাই। মাঝে মাঝে  সময় পেলে বসে সেই বাজারের গল্প করি, ছেলেমেয়েদের সাথে। তারা আনন্দ পায়। আমি বলার চেষ্টা করি, “তখন অভাব ছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা ছিল বড়।

আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবি, সময়ের স্রোত বদলেছে, বাজার বদলেছে, মানুষও বদলেছে। তবু যদি আমরা চাই, সেই পুরনো দিনের আনন্দের কিছুটা আবার ফিরে আসতে পারে। হয়তো তিন কিলোমিটার হাঁটা হবে না, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমানো কি অসম্ভব?

সেই দিনের মতো করে যদি আমরা আবার একে অপরের খোঁজ নিই, সামান্য জিনিস ভাগ করে খাই, বিশ্বাসকে মূল্য দিই, তাহলেই হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া বাজারের আনন্দ নতুন রূপে ফিরে আসবে।

সেই দিন পুরোপুরি হয়তো আর আসবে না। কিন্তু তার আলো এখনও নিভে যায়নি, সে আলো জ্বলে আছে আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের মূল্যবোধে, আমাদের বাবাদের কাঁধে ভর করে শেখা জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঠে। দিন পুরিয়ে যায়, স্বপ্ন পুরায় না। আশায় বুক বাঁধি,”নতুন ভাবে আমাদের পুরনো সংস্কৃতি যদি ফিরে পাই।

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button