Articles & PapersBangladesh Economy

বাংলাদেশের অর্থনীতি: প্রবৃদ্ধির আড়ালে না বলা কথাগুলো

সফলতার গল্পের আড়ালে এমন কিছু বাস্তবতা রয়েছে, যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কমই হয়। অথচ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই “না বলা কথাগুলো” সামনে আনা জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় সাধারণত একটি শব্দই বেশি শোনা যায়, “প্রবৃদ্ধি”। চোখে না দেখা গেলেও এবং ফলাফল না পাওয়া গেলেও গত কয়েক দশকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ইত্যাদি সব মিলিয়ে একটি সফলতার গল্প তৈরি হয়েছে। গল্পটা এমন যে ইমাজিন টাইগার দৌড়ানো শুরু করেছে, উন্নত অর্থনীতির দেশ না হয়ে থামবে না।

কিন্তু এই সফলতার গল্পের আড়ালে এমন কিছু বাস্তবতা রয়েছে, যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা খুব কমই হয়। অথচ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই “না বলা কথাগুলো” সামনে আনা জরুরি।

টেকসই উন্নয়ন বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা পূরণের সক্ষমতাকে অক্ষুন্ন রেখে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর উন্নয়ন প্রক্রিয়া ধরে রাখা এবং পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা তথা পরিবেশ রক্ষা করে দারিদ্র্য দূরীকরণ, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা এবং ক্ষুধা মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য এই না বলা কথাগুলো বলতেই হয়।

প্রথমত, প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও প্রধানত তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই খাত দুটো অনেক আগ থেকেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। এই শিল্প দুটোকে গবেষণার মাধ্যমে কিভাবে প্রতিযোগিতার এগিয়ে রাখা যায় সেই ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি।

দ্বিতীয়ত, শিল্প বৈচিত্র্য সীমিত, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কম, এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। ফলে প্রবৃদ্ধি হলেও তা কতটা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

তৃতীয়ত, গ্রামীন অর্থনীতিকে গুরুত্ব না দেয়া। বাংলাদেশের প্রায় ৭৫% লোক গ্রামে বসবা করে আর প্রায় প্রতিটি মানুষের সাথে গ্রামীণ অর্থনীতি জড়িত। প্রায় ৩০% ভূমি, যা একসময় আমাদের অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল, অনাবাদি পড়ে থাকে। একেতো দূর্বল পরিকল্পনা তার উপর অব্যবহিত সম্পদ তা নিয়ে কিভাবে উন্নয়নের এপথ চলবে, তা একটি বড় প্রশ্ন।

চতুর্থত,সবসময়ই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে আশাবাদী চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়, বাস্তবে তা কিছুটা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাব করলে রিজার্ভের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য অংশ কম থাকে। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়। এরপরও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে পথ, আমাদের দেশে তা সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং থাকে।যে কোন বৈশ্বিক সংকটে সবার আগে আমরা আক্রান্ত হই।এর থেকে বাহির হওয়ার মত পরিকল্পনার অভাব সবসময়।

পঞ্চমত, ব্যাংকিং খাতের নীরব ঝুঁকি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। শুধু মাত্র খেলাপি ঋণের জন্য দুই-চারটা কথা বলাবলি করলে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বয়াবহ সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যাংকিং খাতের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ, কর্পোরেট গভর্নেন্স ইত্যাদি হলো এই খাতের মূল সমস্যা। তাছাড়া, সামগ্রিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যাতিত এই সমস্যা থেকে বের হওয়া দূরহ। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়েছে, কারণ পুনঃতফসিল ও নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে অনেক ঋণকে নিয়মিত দেখানো হয়। এতে আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে।

ষষ্ঠত, মধ্যবিত্ত শ্রেণি এক ধরনের অদৃশ্য চাপে রয়েছে। আয় বৃদ্ধির হার স্থির থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাসস্থান খরচ বাড়ায় মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে। এই “silent squeeze” অর্থনীতির ভোগব্যয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

সপ্তমত, আয় বৈষম্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। বাংলাদেশে সম্পদের বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্ট থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা মোটামুটি এ রকম যে প্রায় ৮০% সম্পদ দেশের শীর্ষ ১০% মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত, অর্থাৎ শীর্ষ ১% মানুষের কাছেই ২৫ থেকে ৩০% বা তার বেশি সম্পদ থাকতে পারে, আর নিচের ৫০% মানুষের কাছে মোট সম্পদের ৫ থেকে ১০% এরও কম সম্পদ। সম্পদের বড় অংশ খুব অল্প সংখ্যক মানুষের হাতে রয়েছে যেটা উচ্চ মাত্রার wealth inequality (সম্পদ বৈষম্য) নির্দেশ করে।একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

অষ্টমত, কর্মসংস্থানের গুণগত দিক দুর্বল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু দক্ষতা অনুযায়ী এবং মানসম্মত চাকরির সংখ্যা তুলনামূলক কম। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে, যা একটি “demographic dividend” কে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

নবমত, বাংলাদেশের একটি বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যে পরিচালিত হয়। এই খাত কর ব্যবস্থার বাইরে থাকায় সরকারের রাজস্ব আহরণ সীমিত থাকে এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভুল তথ্য পাওয়া কঠিন হয়।

দশমত, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। অনেক সময় অর্থনৈতিক দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রাধান্য পায়, যা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণের কারণ হয়।

সবশেষে, সামনে রয়েছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ, স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময়। কিন্তু শুধুমাত্র সাফল্যের গল্প বললে চলবে না, দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানেই প্রকৃত উন্নয়ন নিহিত। বাস্তবতাকে স্বীকার করা এবং তার সমাধানের মধ্য দিয়েই টেকসই অগ্রগতির পথ তৈরি হতে পারে।

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button