Anonymous VoicesBlogs & StoriesStories

ডাকঘরের বেঞ্চে বসে থাকা স্মৃতি

পুরনো ডাকঘরটা আর আগের মতো নেই—এ কথা রফিক সাহেব জানতেন। তবু আজ বহু বছর পর তিনি এখানে এসেছেন। কেন এসেছেন, সেটাও তিনি ঠিক জানেন না। শুধু মনে হয়েছিল, আসা দরকার।

ডাকঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। একসময় যেখানে লোহার গেট ছিল, এখন সেখানে কাঁচের দরজা। ভেতরে ঢুকলেই শীতল বাতাস, উজ্জ্বল আলো, আর ডিজিটাল বোর্ডে ভেসে ওঠা নম্বর। মানুষ আছে, কিন্তু কেমন যেন চেনা নয়।

রফিক সাহেবের হাতে একটি খাম। খামটা খালি। তিনি নিজেই অবাক হয়ে ভাবলেন—খালি খাম নিয়ে ডাকঘরে আসা যায় নাকি? কিন্তু এই খামটা আসলে খালি নয়। এর ভেতরে ভরে আছে একসময়কার অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা, আর ভালোবাসা। একসময় এই ডাকঘরের বেঞ্চে বসে বসে তিনি চিঠির অপেক্ষা করতেন।


 

তখন তিনি নতুন চাকরিতে ঢুকেছেন। জেলা শহর থেকে অনেক দূরে পোস্টিং। সদ্য বিয়ে হয়েছে। স্ত্রী সেলিনা তখন বাবার বাড়িতে। মোবাইল ছিল না। ফোন করার সুযোগও ছিল সীমিত। চিঠিই ছিল একমাত্র ভরসা।

সপ্তাহে একদিন তিনি ছুটি পেলে এই ডাকঘরে এসে বসতেন। কাঠের লম্বা বেঞ্চে। পাশে আরও কয়েকজন বসে থাকত—কারও হাতে মানি অর্ডারের রসিদ, কারও চোখে উৎকণ্ঠা। ডাকপিয়ন যখন ভেতর থেকে বের হতো, সবার চোখ একসাথে তার দিকে ছুটে যেত।

“রফিক আহমেদ?” নামটা শুনলেই বুকের ভেতর কেমন করে উঠত।

সেলিনার চিঠিগুলো খুব সাধারণ ছিল। সংসারের কথা, মায়ের শরীর, পাড়া-পড়শির খবর। কিন্তু প্রতিটা লাইনে থাকত অপেক্ষার উষ্ণতা। তিনি আজও মনে করতে পারেন, চিঠি খুলে পড়ার সময় চারপাশের শব্দ কেমন করে মিলিয়ে যেত।


 

আজ সেই বেঞ্চটা নেই। রফিক সাহেব ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকালেন। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বসে নেই। যান্ত্রিক শৃঙ্খলা। নম্বর ডাকছে মেশিন। তিনি এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ বুকের ভেতর একটা শূন্যতা টের পেলেন।

বেঞ্চটা না থাকায় নয়—
সেলিনা না থাকায়।

সেলিনা চলে গেছেন পাঁচ বছর হলো। ক্যানসার। শেষ দিনগুলোতে তিনি খুব কম কথা বলতেন। শুধু হাতটা ধরে রাখতেন।

সেদিন হাসপাতালে সেলিনা ফিসফিস করে বলেছিলেন,
“তুমি চিঠিগুলো রেখেছ তো?”

তিনি মাথা নেড়েছিলেন। তখন বুঝতে পারেননি, কেন প্রশ্নটা এত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ বুঝছেন।


 

ডাকঘরের এক তরুণ কর্মচারী তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু লাগবে, স্যার?”

রফিক সাহেব একটু থমকালেন। তারপর বললেন,
“না… কিছু না।”

তরুণটা চলে গেল।

তিনি আবার খামটার দিকে তাকালেন। এই খামটা তিনি আজ ইচ্ছে করেই নিয়ে এসেছেন। যেন নিজের সাথে একটা অজুহাত রাখা। একসময় এই খামগুলোই ছিল জীবনের সেতু।

তিনি হঠাৎ মনে করতে লাগলেন—
বর্ষার দিন, ভেজা রাস্তা, চিঠির কালি ছড়িয়ে যাওয়া।
কখনো সেলিনার হাতের লেখা বুঝতে কষ্ট হতো। তবু তিনি বারবার পড়তেন।

আজ ঘরে বসে পড়লে হতো।
কিন্তু তিনি ঘর থেকে বেরিয়েছেন।

কেন?

কারণ কিছু স্মৃতি জায়গা চায়।


 

ডাকঘরের পেছনের দিকটা প্রায় ফাঁকা। সেখানে একটা ছোট দেয়াল আছে। রফিক সাহেব সেখানে হেলান দিলেন।

চোখ বন্ধ করতেই পুরনো ডাকঘরের ছবি ভেসে উঠল।
বেঞ্চ।
চায়ের দোকান।
ডাকপিয়নের ডাক।

তিনি বুঝতে পারলেন—
স্মৃতি কখনো শুধু মনে থাকে না।
সে জায়গা খোঁজে।

এই জায়গাটা না থাকলে স্মৃতিটা ব্যথা হয়ে ওঠে।


 

একজন বয়স্ক লোক ধীরে ধীরে এসে পাশে দাঁড়াল। তাকিয়ে বলল,
“আগে এখানে বেঞ্চ ছিল, তাই না?”

রফিক সাহেব তাকালেন। অচেনা মুখ, কিন্তু পরিচিত কণ্ঠ।

তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ।”

লোকটা হালকা হাসল।
“আমি এখানেই বসে ছেলের চিঠির অপেক্ষা করতাম। এখন সে বিদেশে। চিঠি আসে না।”

কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু রফিক সাহেবের বুক কেঁপে উঠল।

তিনি কিছু বললেন না।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।


 

রফিক সাহেব বুঝলেন—
এই ডাকঘর শুধু চিঠির জায়গা নয়।
এটা অপেক্ষার জায়গা।
ভরসার জায়গা।

আধুনিকতা সেই অপেক্ষাকে সরিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু স্মৃতি সরায়নি।

তিনি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলেন।

দরজার সামনে এসে একবার পেছনে তাকালেন।

বেঞ্চ নেই।
কিন্তু বেঞ্চে বসে থাকা মানুষগুলো এখনো ভেতরে বসে আছে—তার নিজের ভেতরে।

তিনি খামটা পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটা শুরু করলেন।

আজ আর চিঠি আসবে না।
কিন্তু স্মৃতি এসেছে।

আর সেটাই যথেষ্ট।



 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button