
ঘড়িটা থেমে গেছে।
রাকেশের চোখে পড়ল সেই পুরনো ঘড়ি, যা বাবার হাতের ছিল। ঘড়ি আর সময় দেখায় না, কিন্তু রাকেশের মনে বাবার স্মৃতি ফিরে আসে।
১.
বাবা ছিলেন এক আদর্শ মানুষ—কঠোর কিন্তু মমতাময়। ছোটবেলা থেকে তিনি শিখিয়েছেন সময়ের গুরুত্ব, কাজের প্রতি নিষ্ঠা, আর মানুষের প্রতি সদয় মন।
রাকেশ তখন দশ বছর বয়সী। বাবা অফিসে যাওয়ার আগে ঘড়ি পরতেন। তার হাতে ঘড়ি দেখলেই মনে হত—সময় সবসময় চলতে থাকে। ঘড়ির টিকটিক ধ্বনি যেন বাবার কণ্ঠস্বর।
“সময় মানে জীবন,” বাবা বলতেন। “সঠিক ব্যবহার করবি।”
আজ রাকেশ সেই ঘড়ি হাতে ধরল। হাতের মধ্যে ঠান্ডা, ভারী। কিন্তু সেই ঠান্ডাতেও বাবার উপস্থিতি।
২.
বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। ক্যানসার। শেষ দিনগুলোতে রাকেশ ঘরে বসে শুধু দেখত বাবাকে। কিছু বলতে পারত না।
ঘড়ি তখনও কাজ করত। কিন্তু আজ থেমে গেছে। সময় থেমে গেছে। বাবার হাতও থেমে গেছে।
রাকেশ বোঝে—ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না। ঘড়ি মানুষকে স্মরণ করায়। মানুষ চলে গেলেও, স্মৃতি থেমে থাকে না।
৩.
প্রতিদিন রাকেশ অফিসে যায়। কাজের ব্যস্ততা। সভা। রিপোর্ট। ফোন। কিন্তু রাতে ঘরে ফিরে ঘড়িটা হাতে নিলে মনে হয়—বাবা এখনও আছেন।
একদিন তার ছোট বোন বলল, “ভাই, এই ঘড়ি ব্যবহার করো।”
রাকেশ মাথা নেড়েছে। “না। এটি শুধু স্মৃতি।”
বোন কিছু বলেনি। কিন্তু চোখে জিজ্ঞাসা। কীভাবে কিছু জিনিস শুধু স্মৃতি হয়ে যায়, তা বোঝানো যায় না।
৪.
রাকেশ একদিন ভেবেছিল—কেন বাবার ঘড়ি থেমে গেছে? সময়ই তো চলতে থাকে। কিন্তু হয়তো, ঘড়ি বাবার জন্য থেমে গেছে। যখন সে নেই, তখন ঘড়ি দেখায় না।
রাকেশ হেসে দিল। অদ্ভুত। ঘড়ি ঠিক এমনভাবে তার বাবার সঙ্গে যুক্ত।
এটি শুধুই একটি বস্তু নয়। এটি বাবার জীবন, আদর্শ, শিক্ষা। এটি রাকেশের হাতে ধরলেই মনে হয়—সময়ও ভেতরে আছে।
৫.
কিছু স্মৃতি শুধু সুখ নয়। বাবার স্নেহ, গরম হাত, উষ্ণ কণ্ঠস্বর—সব হারানো। কিন্তু ঘড়ি তার পাশে। ঘড়ি থেমে গেছে। কিন্তু স্মৃতি চলতে থাকে।
রাকেশ তখন বুঝল—জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠ হলো— মানুষ চলে যায়, কিন্তু শিক্ষা, আদর্শ, স্মৃতি চিরকাল থাকে।
৬.
রাকেশ ঘড়ি হাতে নিয়ে বাইরে গেল। শহরের হালকা বাতাস। হাঁটতে হাঁটতে ভাবল—বাবার শিক্ষা এখন তার নিজের দায়িত্ব। • সময়কে গুরুত্ব দিতে হবে • মানুষকে ভালোবাসতে হবে • স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হবে
যখন ঘড়ি হাতে থাকে, বাবা পাশে থাকেন। থেকে যায় না। শুধু দেখা যায় না।
৭.
রাকেশ একদিন অফিসে বসে ঘড়িটা ডেস্কে রাখল। ক্লায়েন্ট আসল। কল আসল। রিপোর্ট জমা। ব্যস্ততা। কিন্তু হাত একবার ঘড়ির দিকে যায়।
তার জন্য ঘড়ি আর সময় দেখানোর যন্ত্র নয়। ঘড়ি এখন জীবনের প্রতীক। স্মৃতি। শক্তি। পথপ্রদর্শক।
রাকেশ বুঝল—মানুষের মৃত্যু স্মৃতি মুছে দিতে পারে না। যে শিক্ষা বাবার হাতে ছিল, তা এখন তার হাতে। সময় থেমে গেলেও, স্মৃতি চলতে থাকে।
৮.
রাতের শেষে রাকেশ ঘড়ি হাতে বসে জানালার কাছে। বাতাস হালকা। আকাশ নীল। চোখ বন্ধ করে ঘড়ির টিকটিক শুনল। যদিও থেমে গেছে, মনে হয় টিকটিক বাবার কণ্ঠস্বরের মতো বাজছে। • স্মৃতি আছে • শিক্ষা আছে • ভালোবাসা আছে
ঘড়ি থেমে গেছে, কিন্তু বাবার সময় তার ভিতরে বয়ে চলেছে।
রাকেশ হালকা হাসল। জানল—বাবা নেই। কিন্তু তার ঘড়ি, তার স্মৃতি, তার শিক্ষা, সবই সঙ্গে আছে।
সেই ঘড়ি থেমে থাকলেও, জীবন চলতে থাকে। আর স্মৃতি চিরকাল বাঁচে।

