মায়ের আলমারিতে রাখা নীল শাড়ি
নীল শাড়িটা অচেনা নয়। কিন্তু আজ যখন মেয়ে আলমারি খুলল, হাতে নিলে কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে গেল।
শাড়িটা মায়ের। আর মা নেই অনেক দিন হলো। ক্যানসার। জীবন শেষ। হাসি নেই। হাতের উষ্ণতা নেই। শুধু স্মৃতি বাকি।
মেয়েটি, সুমিতা, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে। মা মানসিকভাবে সবসময় তাকে উত্সাহ দিয়েছিলেন, কিন্তু শারীরিকভাবে অনেক সময় দুর্বল থাকতেন। বাবা আগে মারা গেছেন। তাই মায়ের ভালোবাসাই সব ছিল।
আজকাল সুমিতার নিজের জীবন ব্যস্ত—চাকরি, বন্ধু, পড়াশোনা। কিন্তু আলমারি খুললেই সব থেমে যায়। সব ভোরের দিনগুলো ফিরে আসে।
১.
সুমিতা বসে শাড়িটা হাতে ধরে। নরম কাপড়। কানের কাছে আনার সাথে সাথে এক অদ্ভুত শীতল স্পর্শ। মনে হল মা আজও এখানে আছে, পাশেই দাঁড়িয়ে।
শাড়ি পরে মা সবসময় বলতেন, “সুমি, এই রঙটি মনে রাখবি। শক্তি দেয়। ভয়কে হারায়।”
সে দিনগুলো মনে পড়ে গেল— শাড়ি পড়ে মা বাজারে যেতেন, বস্তু কিনতেন, গল্প করতেন। কখনো হাসি, কখনো কান্না। সব সময় শাড়ি নীল। নীল শাড়ি মানে আশা, মা বলতেন।
আজ সে শাড়িটা হাতে ধরে, চোখে পানি। মা নেই। কিন্তু শাড়ি আছে।
কিছু স্মৃতি পরার নয়। ধরার।
২.
শাড়িটা খুলে রাখতেই মনে হলো, কেন এতদিন রাখিনি। প্রতিদিন অন্য কাজ, ব্যস্ততা, ফোন, সামাজিক যোগাযোগ—সব কিছুই স্মৃতিকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে।
সুমিতা নিজের ঘরে বসে ভাবল—মা ঠিক কেমন থাকতেন। শাড়ি গায়ে লাগিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। তিনি শাড়ি পরে নন—কেবল বুকের কাছে চেপে ধরলেন।
ক্লাসরুম, বাজার, বন্ধুর বাড়ি—সব জায়গায় মা তাকে সঙ্গে ছিলেন না। কিন্তু শাড়ি সেই উপস্থিতি ফিরিয়ে আনল।
শাড়িটা শুধু কাপড় নয়। এটি একটি স্মৃতি, যা সময়কে পেরিয়ে আসে।
৩.
সুমিতা হঠাৎ চোখ বন্ধ করল। সে স্মৃতির মধ্যে ঢুকে গেল। শিশুকাল। মা স্কুলে যাওয়ার আগে রোজ বলতেন, “সুমি, ভালো থাকবি। পড়াশোনা মন দিয়ে। মানুষকে সাহায্য করবি।”
শিশু সুমিতা তখন কেবল হাসি দিত। মা তার ভবিষ্যতের কথা বলতেন। কিন্তু এখন সেই ভবিষ্যৎ বাস্তব।
সে একদিন চাকরিতে প্রথম গিয়েছিল। মন ভারি। ফোনে মা থাকতেন না। কণ্ঠ শুনতে চেয়েছিল। কিন্তু শাড়িটাই ছিল। রঙ, উষ্ণতা, আশ্বাস—সবই শাড়ির মধ্যে।
স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠল। শাড়ি একমাত্র সেতু।
৪.
সেদিন সুমিতার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল। বন্ধুটি বলল, “তুই কেন রোজ এমন ভাবছিস? মা নেই তো। সময়ও চলে গেছে।”
সুমিতা হাসল। “না, সময় গেছে, কিন্তু স্মৃতি আছে। সেই স্মৃতির মধ্যে মা আছে।”
বন্ধুটি কিছু বুঝল না। সে সবসময় আধুনিক, বাস্তব। কিন্তু সুমিতার কাছে মা বাস্তবতার চেয়ে বড়।
শাড়ি খুলে রাখলে সে শুধু শাড়ি দেখছে না। দেখছে প্রেম, ভালোবাসা, শিক্ষা, মায়া—সব।
৫.
সুমিতা ভাবল—এই শাড়ি তার জীবনে কত প্রভাব ফেলেছে। • ছোটবেলায় নিরাপত্তা। • বড় হওয়ার সময়ে শক্তি। • আজ, অল্প বয়সে দায়িত্বের ভার।
শাড়ির নীল রঙ তাকে বলছে—দূরত্ব, শূন্যতা, কিন্তু আশা। প্রতিদিন যখন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে, চোখ বন্ধ করে শাড়ি স্পর্শ করলে মা ফিরে আসে।
মা তাকে কখনো বলেছেননি, “নিজের জীবন তৈরি করো।” কিন্তু আজ বুঝতে পারছে, এই শাড়ি সেই নির্দেশ।
৬.
স্মৃতি শুধু সুখ নয়। কখনো-কখনো ব্যথাও থাকে।
সেদিন মা হাসপাতালে ছিলেন। ক্যানসারের অগ্নিকুণ্ড। হাত ধরতে চাইলে শীর্ণ হয়ে যেত। তখন সুমিতা বুঝেছিল—সময় সবকিছু শেষ করে দেয়।
আজ শাড়ি হাতে নিলেই সে সেই সময় ফিরে পায়। হাতে হাত, হাসি, চোখের ভেতরের প্রেম—সবই।
এখনো যখন অফিস থেকে ফিরে আসে, ব্যস্ততার মাঝেও শাড়ি স্পর্শ করে। • ভাবতে শেখে। • মায়ের কথা মনে পড়ে। • নিজের জীবনকে সামলাতে শক্তি পায়।
৭.
শাড়িটা শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়। এটি শিখিয়েছে—জীবন কত দ্রুত চলে। স্মৃতি ধরে রাখতে হলে মনও থাকতে হবে প্রস্তুত।
সুমিতা শাড়ি আবার আলমারিতে রাখল। এবার ভয়ে নয়। সম্মানের সঙ্গে। যেন মা দেখেন, তিনি সব ঠিক রেখেছেন।
একটা সময়, শাড়ি শুধু কাপড় ছিল। আজ, শাড়ি হলো শক্তি, শিক্ষা, মা।
সুমিতা জানল—মা কখনো হারায় না। স্মৃতি থাকলেই মা আছে।
৮.
রাত হয়ে গেছে। ঘর শান্ত। বাতাসে হালকা বাতাস, পর্দার পাশে কুঁড়ি খোলা।
সুমিতা শাড়িটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে বসে রইল। চোখ বন্ধ। স্মৃতি স্পর্শ। মা আজও হাসছে। শাড়ি বলছে—“ভয় নয়, এগিয়ে যাও।”
স্মৃতি জীবন্ত। শাড়ি সেই জীবনের চিহ্ন। মা নেই, কিন্তু মা আছে।
শুধু অনুভব করতে হবে।

