স্টেশনের শেষ ট্রেন
রাতের শেষ ট্রেনটা আসে, প্রায়ই বিলম্বে। স্টেশনটা ছোট, নির্জন। হালকা বাতাসে ভাসে লাইটের আলো। কিছু মানুষ আসে, কিছু মানুষ চলে যায়। কিন্তু কামাল জানে—এই স্টেশন আর শুধু ট্রেনের জন্য নয়। এটি তার স্মৃতির স্টেশন।
কামাল প্রতিদিন এখানে আসে। কাজের চাপ, শহরের ভিড়—সব ভুলে। সে বসে থাকে একাকী। কেউ বোঝে না। কেউ জিজ্ঞেস করে না।
১.
যে সময়ের কথা কথা বলা যায়, সেই সময় ১৫ বছর আগে। কামাল তখন কলেজের ছাত্র। বন্ধুর সঙ্গে একটি পরিকল্পনা করেছিল—বিদেশে পড়াশোনা। বিদায়ের দিন।
স্টেশনটা তখনও আজকের মতো ছোট ছিল না। কাঠের বেঞ্চ, বাতাসে ধোঁয়া মেশানো লাইট, ছোট্ট কফির দোকান।
কামাল ও তার বন্ধু, আরিফ, দাঁড়িয়েছিল ট্রেনের পাশে।
“আমরা কি সত্যিই আর দেখা করব না?” কামাল ভয়কে চাপা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
আরিফ চুপ করে থাকল। “হয়তো না। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব থেমে যাবে না।”
ট্রেন চলে গেল। কামালের মনে কিছুটা খালি, কিছুটা শান্তি। সে তখন জানত না—সেই বিদায় তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের বোঝা হবে।
২.
আজকাল কামাল এখানে আসে একা। বন্ধু আরিফ এখন বিদেশে। ফোনে কথা হয়, কিন্তু হাতের স্পর্শ নেই, চোখের দেখা নেই।
কিছুক্ষণ সে বেঞ্চে বসে থাকে। নেই বেঞ্চটা ঠিক সেইটা—কিন্তু মনে হয়, তার জন্য বেঞ্চের একটা অংশ এখনো রয়ে গেছে।
ট্রেনের শব্দ শুনে সে চোখ বন্ধ করে। শিহরণ আসে। স্মৃতি ভেসে আসে। • আরিফের হাসি • কফি দোকানের গরম চা • স্টেশনের বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া কথা
সব মনে পড়ে, যেন ট্রেনের মতো।
৩.
একদিন, কামাল স্টেশনের কফির দোকান থেকে চা নিয়েছিল। বসে বসে দেখল, এক বৃদ্ধ লোক ট্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে। হাতের মধ্যে পুরনো ব্যাগ। চোখে কিছু হারানো।
কামাল কাছে গিয়ে বলল, “ট্রেন আসবে।”
বৃদ্ধ হেসে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু কোন ট্রেন?”
কামাল কিছু বুঝল না। বৃদ্ধ ফিরে তাকাল। “শেষ ট্রেন—যে ট্রেন শুধু স্মৃতি নিয়ে যায়।”
কামাল বুঝল—এই স্টেশন শুধু যাত্রার নয়, বরং বিদায়েরও। এখানে মানুষের জীবন, সম্পর্ক, সবই থেমে আসে এক মুহূর্তের জন্য।
৪.
কিছু স্মৃতি আবার ফিরে আসে।
কামালকে মনে পড়ল—কলেজের সেই দিনগুলো, বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া, মা-বাবার কথা, প্রথম প্রেমের বিদায়। সবই যেন স্টেশনের সঙ্গে মিশে গেছে।
ট্রেন আসে। মানুষ ওঠে। কম্পার্টমেন্ট ভরে যায়। কেউ হাসে, কেউ কান্না করে। কামাল বসে থাকে। কেউ তাকায় না। কিন্তু সে দেখছে—স্মৃতি সবকে ঘিরে ধরে।
স্মৃতি কখনো বিদায় নেয় না। সেটা শুধু দেখা হয়।
৫.
কামাল তার বন্ধুকে মনে করল—আরিফ।
ফোনে কখনও কথা হয়। কিন্তু মনে হয় কিছু হারিয়েছে। চোখের দেখা, হাতের স্পর্শ, হেসে ওঠার মুহূর্ত—সব ট্রেনের মতো চলে গেছে।
কিন্তু প্রতিদিন এখানে বসে সে ট্রেনের শব্দ শোনে। মনে করে—কখনও যদি দেখা হয়? হয়তো হবে না। হয়তো হবে।
কিছু স্মৃতি আসে না। কিছু স্মৃতি আসে।
কামাল বুঝল—এই স্টেশন তার জীবনের পাঠ। বিদায়, আশা, ভালোবাসা, স্মৃতি—সব।
৬.
এক রাত, স্টেশনে খুব কম মানুষ ছিল। হালকা বাতাসে ধোঁয়া ভেসে যায়। কামাল বেঞ্চে বসে। হাতের মধ্যে পুরনো খাতার পাতা। সেখানে লেখা আছে—“শেষ ট্রেন কখনো আসে না।”
সে হেসে দিল। “শুধু আসে স্মৃতি নিয়ে।”
ট্রেন চলে যায়। মানুষের জীবনের মতো। শুধু দেখা থাকে। শুধু অনুভব থাকে।
কামাল জানে—স্মৃতি কিছু থেমে যায়। কিছু যায় না।
এভাবেই তার রাতগুলো কাটে। ট্রেন আসে। চলে যায়। কিন্তু স্মৃতি থাকে।
৭.
কিছু সময় পরে, কামাল স্টেশনের রেকর্ডের কাজ পেয়েছিল। পুরনো আর্থিক নথি, ট্রেনের সময়সূচি। বসে বসে দেখল—পুরনো ট্রেনের সময় আর নেই। কিন্তু স্টেশনটি আছে।
হয়তো ট্রেন বদলেছে। কিন্তু স্মৃতি বদলায় না। কামাল বুঝল—সময় পরিবর্তন করে সব। জীবন বদলায়। কিন্তু স্মৃতি মানুষের সাথে থাকে, এমনকি যখন ট্রেন চলে যায়।
৮.
রাতের শেষ ট্রেন আবার এল। কামাল দাঁড়াল প্ল্যাটফর্মে। বাতাস ঠান্ডা। চোখ বন্ধ করে ট্রেনের শব্দ শোনাল।
একটু হাসল। একটু কেঁদে গেল। তার স্মৃতি, বন্ধুর স্মৃতি, প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি—সব ট্রেনের সঙ্গে চলে গেল।
কিন্তু রয়ে গেছে কিছু। স্টেশন। বেঞ্চ। স্মৃতি।
যে শেষ ট্রেন আসে না, কিন্তু স্মৃতি সবসময় নিয়ে আসে।
কামাল ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। স্টেশন ছেড়ে, শহরের দিকে। হৃদয় ভারী, মন শান্ত। কারণ সে জানে—শেষ ট্রেন চলে গেলেও, স্মৃতি তার ভেতরে চিরকাল থাকবে।

