Blogs & Stories
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের সমন্বিত নীতি: উৎপাদন ও ভ্যালু এডিশন ভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা (A Comprehensive Policy Paper)
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের সমন্বিত নীতি: উৎপাদন ও ভ্যালু এডিশন ভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা
(A Comprehensive Policy Paper)
(মোহাম্মদ শহীদ উল্যাহ্ এফসিএ
সিনিয়র ব্যাংকার।)
সারসংক্ষেপ (Abstract):
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও গ্রামীণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এখনও গ্রামে বাস করে। এই ৭০% জনসংখ্যাকে এখনও দেশের মূল অর্থনীতির সাথে ভূমিকা ভিত্তিক সংযুক্ত করা যায় নি। যদিও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে গ্রামীণ উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কাঁচামাল উৎপাদনের মধ্যে এখনও সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে যেখানে পর্যাপ্ত ভ্যালু এডিশন, বাজার সংযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের অনেক অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া অসম্ভব বা সময় সাপেক্ষ।
উপরে উল্লেখিত সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে এখানে একটি নীতি প্রস্তাবনা পেশ করা হলো যাতে একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ শিল্প উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ব্যাংকিং সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া যায়।
১. ভূমিকা:
বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে এবং কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ড তাদের প্রধান জীবিকার উৎস। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের অধিকাংশই কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি হয়, যার ফলে কৃষক কম মূল্য পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকে। পণ্য উৎপাদনে তারা যুগ যুগ ধরে তাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে, তাতে তারা কম উৎপাদন পায়। সময়ে সময়ে উন্নত উদ্ভাবন তাদের অজানা থেকে যায়। তাছাড়া বাজার সম্পর্কে অতি দ্রুত ও সঠিক তথ্যের অভাবে তাদের উৎপাদিত পণ্যের কম মূল্য পেয়ে থাকে।
তাই একটি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন:
1. সর্বোচ্চ কৃষি উৎপাদন;
2. ভ্যালু এডিশন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ;
3. দক্ষ মানবসম্পদ;
4. সহজ অর্থায়ন;
5. ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. নীতিগত দর্শন (Policy Philosophy):
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের মূল দর্শন হলো-
“উৎপাদন + ভ্যালু এডিশন + দক্ষতা + বাজার সংযোগ = টেকসই উন্নয়ন”
এই নীতির মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভ থাকে-
১. উৎপাদন বৃদ্ধি
২. ভ্যালু এডিশন
৩. দক্ষতা উন্নয়ন
৪. আর্থিক সহায়তা ও বাজার সংযোগ।
এই চারটির কোনটিই আমরা এখনো সঠিকভাবে করতে পারি, কারণ এই বিষয়গুলোর উপর অতীতে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যদি এই বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়, তবে সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাবে। কারণ, যে কোন অর্থনীতির মূল হলো উৎপাদন বা ভ্যালু এডিশন। উৎপাদনে সাথে জড়িত কর্মসংস্থান, অর্থনীতির সামগ্রিক সাইকেল সর্বোপরি জিডিপি।
৩. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল
৩.১ পতিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য কৃষি জমির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এর জন্য নীতিগত ব্যবস্থা হলো:
1. কৃষি জমি পতিত রাখা নিরুৎসাহিত করা
2. ইউনিয়ন পর্যায়ে পতিত জমির তালিকা প্রস্তুত
3. পতিত জমি আবাদে আনতে সহজ ঋণ ও প্রযুক্তি সহায়তা
4. সরকারিভাবে কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচারএক্সটেনশন।
৩.২ বহুমুখী ও বহু ফসলি কৃষি
একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। যেমন- উঁচু জমিতে সবজি ও ডাল, মাঝারি জমিতে ধান ও সবজি চাষ এবং নিচু জমিতে মাছও ধান চাষ করা যেতে পারে।
৩.৩ মাটি পরীক্ষা ও কৃষি পরামর্শ:
প্রতিটি ইউনিয়নে মাটি পরীক্ষা সেবা চালু করা প্রয়োজন। মাটির প্রকার ও উর্বরতার উপর নির্ভর করে কৃষক চাষাবাদ করবে। এতে কৃষক মাটির উর্বরতা বিশ্লেষণ, উপযুক্ত ফসল নির্বাচন, এবং সার ব্যবহারের পরামর্শ সরকারি কৃষি বিভাগ থেকে পাবে এবং ফলন বাড়বে।
৪. গ্রামীণ ডিজিটাল কৃষি সেবা:
প্রতিটি ইউনিয়নে একটি ডিজিটাল কৃষি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। এই কেন্দ্র থেকে কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজার মূল্য তথ্য, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, রোগ ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয় জানতে এবং ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে Access to Information program (a2i).
৫. দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ:
গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে। এব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংক সহায়তা করতে পারে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশে অতীতে সফলতা পাওয়া গেছে।
এই প্রশিক্ষণ প্রদানে ডিপার্টমেন্ট অফ ইউথ ডেভেলপমেন্ট ও অন্যান্য লোকাল ও বিদেশি অভিজ্ঞ লোক ও প্রতিষ্ঠান কে আহবান জানানো যেতে পারে।
প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রসমূহ যেমন-
পুরুষদের জন্য:
– আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি;
– মাছ চাষ;
– ডেইরি ফার্মিং;
– কৃষি যন্ত্র চালনা।
আর মহিলাদের জন্য:
– খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ;
– হাঁস-মুরগি পালন;
– হস্তশিল্প;
– অনলাইন ব্যবসা।
উভয় ক্ষেত্রে রপ্তানিযোগ্য ও আমদানি বিকল্প পণ্যকে গুরুত্ব দেয়া অধিক সমীচীন হবে।
৬. ভ্যালু এডিশন ও গ্রামীণ শিল্প উন্নয়ন
কাঁচামাল বিক্রির পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয় অধিক বৃদ্ধি করা সম্ভব যেমন কাঁচা পণ্য কে ভ্যালু এডেড পণ্যে রুপান্তর, ধান থেকে চাল, চালের গুঁড়া তৈরী করা, দুধ থেকে দই, ঘি তৈরী করা, আম থেকে আমসত্ত্ব তৈরী এবং মাছ থেকে শুকনা মাছ তৈরী করে বিক্রি অথবা রপ্তানি করা যায়।
গ্রামে ছোট আকারের প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন করলে কর্মসংস্থান আরও বাড়বে।
৭. ব্যাংকিং ও অর্থায়ন
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য সহজ ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন উৎপাদন, ভ্যালু এডিশন অথবা ব্যবসায় মুলধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুলধন ছাড়া কোন কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আবার গ্রামের গরীব মানুষ ঋণের জন্য কোন জামানত প্রদান করতে পারবে না। তাই, এক্ষেত্রে বানিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি ব্যাংক ক্লাস্টার ভিত্তিক জামানতবিহিন গ্রুপ ঋণ দিতে পারে। বৃহৎ ঋণ যে হারে খেলাপি হয় এবং যে হারে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে, ক্ষুদ্র ঋণ সেই তুলনায় কম খেলাপী হবে এবং অধিক ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্পোরেট স্যোসাল রেসপনসেবলিটি থেকেও এটা করতে পারে। টাকা পাচার হবে না।
ঋণ প্রদানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সমূহ হলো:
– বাণিজ্যিক ব্যাংকং;
– বাংলাদেশ ব্যাংকং
– বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক;
– পল্লী সন্ঞয় ব্যাংক;
– বিভিন্ন এনজিও।
৭.১ গ্রুপ গ্যারান্টি ভিত্তিক ঋণ
অনেক গ্রামীণ উদ্যোক্তার কাছে জামানত নেই। জামানত বিহীন ঋণ অনেক সময় বেশি নিরাপদ হয়। যেমন, বর্তমানে এনজিও ঋণ, যেখানে আদায় হার বেশি।
তাই এক্ষেত্রে প্রস্তাব হলো:
– ৫–১০ জনের গ্রুপ করে ঋণ বিতরণ;
– পারস্পরিক গ্যারান্টির ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ;
– জামানত ছাড়া ঋণ
৮. বাজার উন্নয়ন
কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ন্যায্য মূল্য কৃষকরা পায় না কয়েকটি কারণে, যেমন- বাজার মূল্যের খবর না পাওয়া, বাজারজাতকরণের সমস্যা, ব্যাপারী ও পড়িয়াদের দৌরাত্ম্য, সময়মত যানবাহন না পাওয়া, সংরক্ষণের হিমাগারের অভাব ইত্যাদি।
এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত:
– কার্যকর ভাবে স্থানীয় কৃষি বাজার মনিটরিং;
– মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ;
– ডিজিটাল বাজার তথ্য;
– যানবাহন সহজলভ্য করা;
– প্রয়োজনীয় হিমাগারের ব্যবস্থা করা।
৯. রপ্তানি উন্নয়ন
গ্রামীণ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু গ্রামের কৃষক ও সহজ-সরল মানুষ এটা কম বুঝে। এব্যাপারে থানা কৃষি বিভাগ ও রপ্তানি উন্নয়ন বিভাগ একত্রে কাজ করতে পারে।
সম্ভাব্য পণ্য হতে পারে:
– ফল;
– সবজি;
– শুকনা মাছ;
– হস্তশিল্প;
– বিভিন্ন অপ্রচলিত পণ্য।
১০. প্রশাসনিক সমন্বয়
গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য জেলা পর্যায়ে নিন্মলিখিত একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
“District Rural Economic Development Committee”.
একমিটির গঠন হবে নিন্মলিখিত ভাবে :
সভাপতি: জেলা প্রশাসক।
সদস্য:
– কৃষি কর্মকর্তা;
– ব্যাংক প্রতিনিধি;
– যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা;
– স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি।
১১. পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো উপরের সমস্ত কার্যকর মনিটরিং করা। অতীতে অনেক উদ্যোগ সরকারি অনিহা ও অবহেলার কারণে ভালো উদ্যোগ ও সফলতা পায়নি।
তাই, উচ্চ পর্যায়ে থেকে প্রতি বছর নিম্নোক্ত সূচক মূল্যায়ন করা হবে:
1. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধ
2. কৃষি জমির সঠিক ব্যবহার;
3. ভ্যালু এডিশন কার্যক্রম;
4. গ্রামীণ কর্মসংস্থান;
5. কৃষকের আয় বৃদ্ধি;
6. রপ্তানি বৃদ্ধি;
7. প্রশিক্ষণ কার্যক্রম;
8. ব্যাংক ঋণ প্রদান ও ব্যবহার;
9. নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি।
১২. প্রত্যাশিত ফলাফল
এটি একটা সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়নের রূপরেখা, এই রুপরেখার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের দরকার হতে পারে যা অবশ্যই অবস্থার প্রেক্ষাপটে।
এই নীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ফলেআশা করা যায়:
– পতিত জমি কমবে;
– কৃষি উৎপাদন বাড়বে;
– গ্রামীণ শিল্প বৃদ্ধি পাবে;
– বেকারত্ব কমবে;
– কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।
উপসংহার
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া যেখানে কৃষি, শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়ন এবং বাজার ব্যবস্থাকে একসাথে কাজ করতে হয়। যদি সরকার, ব্যাংক, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে গ্রামীণ বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
রেফারেন্স:
– Food and Agriculture Organization (2021). Rural Development and Agricultural Productivity.
– World Bank (2022). Agriculture and Rural Development in South Asia.
– Bangladesh Bureau of Statistics (2023). Agricultural Statistics of Bangladesh.
– Bangladesh Planning Commission (2022). Perspective Plan of Bangladesh 2041.
(A Comprehensive Policy Paper)
(মোহাম্মদ শহীদ উল্যাহ্ এফসিএ
সিনিয়র ব্যাংকার।)
সারসংক্ষেপ (Abstract):
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও গ্রামীণ অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এখনও গ্রামে বাস করে। এই ৭০% জনসংখ্যাকে এখনও দেশের মূল অর্থনীতির সাথে ভূমিকা ভিত্তিক সংযুক্ত করা যায় নি। যদিও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে গ্রামীণ উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কাঁচামাল উৎপাদনের মধ্যে এখনও সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে যেখানে পর্যাপ্ত ভ্যালু এডিশন, বাজার সংযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়নের অনেক অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া অসম্ভব বা সময় সাপেক্ষ।
উপরে উল্লেখিত সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে এখানে একটি নীতি প্রস্তাবনা পেশ করা হলো যাতে একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ শিল্প উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ব্যাংকিং সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া যায়।
১. ভূমিকা:
বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে এবং কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ড তাদের প্রধান জীবিকার উৎস। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের অধিকাংশই কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি হয়, যার ফলে কৃষক কম মূল্য পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকে। পণ্য উৎপাদনে তারা যুগ যুগ ধরে তাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে, তাতে তারা কম উৎপাদন পায়। সময়ে সময়ে উন্নত উদ্ভাবন তাদের অজানা থেকে যায়। তাছাড়া বাজার সম্পর্কে অতি দ্রুত ও সঠিক তথ্যের অভাবে তাদের উৎপাদিত পণ্যের কম মূল্য পেয়ে থাকে।
তাই একটি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন:
1. সর্বোচ্চ কৃষি উৎপাদন;
2. ভ্যালু এডিশন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ;
3. দক্ষ মানবসম্পদ;
4. সহজ অর্থায়ন;
5. ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. নীতিগত দর্শন (Policy Philosophy):
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের মূল দর্শন হলো-
“উৎপাদন + ভ্যালু এডিশন + দক্ষতা + বাজার সংযোগ = টেকসই উন্নয়ন”
এই নীতির মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভ থাকে-
১. উৎপাদন বৃদ্ধি
২. ভ্যালু এডিশন
৩. দক্ষতা উন্নয়ন
৪. আর্থিক সহায়তা ও বাজার সংযোগ।
এই চারটির কোনটিই আমরা এখনো সঠিকভাবে করতে পারি, কারণ এই বিষয়গুলোর উপর অতীতে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যদি এই বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়, তবে সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাবে। কারণ, যে কোন অর্থনীতির মূল হলো উৎপাদন বা ভ্যালু এডিশন। উৎপাদনে সাথে জড়িত কর্মসংস্থান, অর্থনীতির সামগ্রিক সাইকেল সর্বোপরি জিডিপি।
৩. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল
৩.১ পতিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য কৃষি জমির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এর জন্য নীতিগত ব্যবস্থা হলো:
1. কৃষি জমি পতিত রাখা নিরুৎসাহিত করা
2. ইউনিয়ন পর্যায়ে পতিত জমির তালিকা প্রস্তুত
3. পতিত জমি আবাদে আনতে সহজ ঋণ ও প্রযুক্তি সহায়তা
4. সরকারিভাবে কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচারএক্সটেনশন।
৩.২ বহুমুখী ও বহু ফসলি কৃষি
একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। যেমন- উঁচু জমিতে সবজি ও ডাল, মাঝারি জমিতে ধান ও সবজি চাষ এবং নিচু জমিতে মাছও ধান চাষ করা যেতে পারে।
৩.৩ মাটি পরীক্ষা ও কৃষি পরামর্শ:
প্রতিটি ইউনিয়নে মাটি পরীক্ষা সেবা চালু করা প্রয়োজন। মাটির প্রকার ও উর্বরতার উপর নির্ভর করে কৃষক চাষাবাদ করবে। এতে কৃষক মাটির উর্বরতা বিশ্লেষণ, উপযুক্ত ফসল নির্বাচন, এবং সার ব্যবহারের পরামর্শ সরকারি কৃষি বিভাগ থেকে পাবে এবং ফলন বাড়বে।
৪. গ্রামীণ ডিজিটাল কৃষি সেবা:
প্রতিটি ইউনিয়নে একটি ডিজিটাল কৃষি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। এই কেন্দ্র থেকে কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজার মূল্য তথ্য, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, রোগ ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয় জানতে এবং ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে Access to Information program (a2i).
৫. দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ:
গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে সরকারকে কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে। এব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংক সহায়তা করতে পারে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশে অতীতে সফলতা পাওয়া গেছে।
এই প্রশিক্ষণ প্রদানে ডিপার্টমেন্ট অফ ইউথ ডেভেলপমেন্ট ও অন্যান্য লোকাল ও বিদেশি অভিজ্ঞ লোক ও প্রতিষ্ঠান কে আহবান জানানো যেতে পারে।
প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রসমূহ যেমন-
পুরুষদের জন্য:
– আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি;
– মাছ চাষ;
– ডেইরি ফার্মিং;
– কৃষি যন্ত্র চালনা।
আর মহিলাদের জন্য:
– খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ;
– হাঁস-মুরগি পালন;
– হস্তশিল্প;
– অনলাইন ব্যবসা।
উভয় ক্ষেত্রে রপ্তানিযোগ্য ও আমদানি বিকল্প পণ্যকে গুরুত্ব দেয়া অধিক সমীচীন হবে।
৬. ভ্যালু এডিশন ও গ্রামীণ শিল্প উন্নয়ন
কাঁচামাল বিক্রির পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয় অধিক বৃদ্ধি করা সম্ভব যেমন কাঁচা পণ্য কে ভ্যালু এডেড পণ্যে রুপান্তর, ধান থেকে চাল, চালের গুঁড়া তৈরী করা, দুধ থেকে দই, ঘি তৈরী করা, আম থেকে আমসত্ত্ব তৈরী এবং মাছ থেকে শুকনা মাছ তৈরী করে বিক্রি অথবা রপ্তানি করা যায়।
গ্রামে ছোট আকারের প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন করলে কর্মসংস্থান আরও বাড়বে।
৭. ব্যাংকিং ও অর্থায়ন
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য সহজ ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন উৎপাদন, ভ্যালু এডিশন অথবা ব্যবসায় মুলধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুলধন ছাড়া কোন কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আবার গ্রামের গরীব মানুষ ঋণের জন্য কোন জামানত প্রদান করতে পারবে না। তাই, এক্ষেত্রে বানিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি ব্যাংক ক্লাস্টার ভিত্তিক জামানতবিহিন গ্রুপ ঋণ দিতে পারে। বৃহৎ ঋণ যে হারে খেলাপি হয় এবং যে হারে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে, ক্ষুদ্র ঋণ সেই তুলনায় কম খেলাপী হবে এবং অধিক ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্পোরেট স্যোসাল রেসপনসেবলিটি থেকেও এটা করতে পারে। টাকা পাচার হবে না।
ঋণ প্রদানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সমূহ হলো:
– বাণিজ্যিক ব্যাংকং;
– বাংলাদেশ ব্যাংকং
– বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক;
– পল্লী সন্ঞয় ব্যাংক;
– বিভিন্ন এনজিও।
৭.১ গ্রুপ গ্যারান্টি ভিত্তিক ঋণ
অনেক গ্রামীণ উদ্যোক্তার কাছে জামানত নেই। জামানত বিহীন ঋণ অনেক সময় বেশি নিরাপদ হয়। যেমন, বর্তমানে এনজিও ঋণ, যেখানে আদায় হার বেশি।
তাই এক্ষেত্রে প্রস্তাব হলো:
– ৫–১০ জনের গ্রুপ করে ঋণ বিতরণ;
– পারস্পরিক গ্যারান্টির ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ;
– জামানত ছাড়া ঋণ
৮. বাজার উন্নয়ন
কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ন্যায্য মূল্য কৃষকরা পায় না কয়েকটি কারণে, যেমন- বাজার মূল্যের খবর না পাওয়া, বাজারজাতকরণের সমস্যা, ব্যাপারী ও পড়িয়াদের দৌরাত্ম্য, সময়মত যানবাহন না পাওয়া, সংরক্ষণের হিমাগারের অভাব ইত্যাদি।
এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত:
– কার্যকর ভাবে স্থানীয় কৃষি বাজার মনিটরিং;
– মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ;
– ডিজিটাল বাজার তথ্য;
– যানবাহন সহজলভ্য করা;
– প্রয়োজনীয় হিমাগারের ব্যবস্থা করা।
৯. রপ্তানি উন্নয়ন
গ্রামীণ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু গ্রামের কৃষক ও সহজ-সরল মানুষ এটা কম বুঝে। এব্যাপারে থানা কৃষি বিভাগ ও রপ্তানি উন্নয়ন বিভাগ একত্রে কাজ করতে পারে।
সম্ভাব্য পণ্য হতে পারে:
– ফল;
– সবজি;
– শুকনা মাছ;
– হস্তশিল্প;
– বিভিন্ন অপ্রচলিত পণ্য।
১০. প্রশাসনিক সমন্বয়
গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য জেলা পর্যায়ে নিন্মলিখিত একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
“District Rural Economic Development Committee”.
একমিটির গঠন হবে নিন্মলিখিত ভাবে :
সভাপতি: জেলা প্রশাসক।
সদস্য:
– কৃষি কর্মকর্তা;
– ব্যাংক প্রতিনিধি;
– যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা;
– স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি।
১১. পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো উপরের সমস্ত কার্যকর মনিটরিং করা। অতীতে অনেক উদ্যোগ সরকারি অনিহা ও অবহেলার কারণে ভালো উদ্যোগ ও সফলতা পায়নি।
তাই, উচ্চ পর্যায়ে থেকে প্রতি বছর নিম্নোক্ত সূচক মূল্যায়ন করা হবে:
1. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধ
2. কৃষি জমির সঠিক ব্যবহার;
3. ভ্যালু এডিশন কার্যক্রম;
4. গ্রামীণ কর্মসংস্থান;
5. কৃষকের আয় বৃদ্ধি;
6. রপ্তানি বৃদ্ধি;
7. প্রশিক্ষণ কার্যক্রম;
8. ব্যাংক ঋণ প্রদান ও ব্যবহার;
9. নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি।
১২. প্রত্যাশিত ফলাফল
এটি একটা সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়নের রূপরেখা, এই রুপরেখার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের দরকার হতে পারে যা অবশ্যই অবস্থার প্রেক্ষাপটে।
এই নীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ফলেআশা করা যায়:
– পতিত জমি কমবে;
– কৃষি উৎপাদন বাড়বে;
– গ্রামীণ শিল্প বৃদ্ধি পাবে;
– বেকারত্ব কমবে;
– কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।
উপসংহার
গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়ন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া যেখানে কৃষি, শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়ন এবং বাজার ব্যবস্থাকে একসাথে কাজ করতে হয়। যদি সরকার, ব্যাংক, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে গ্রামীণ বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
রেফারেন্স:
– Food and Agriculture Organization (2021). Rural Development and Agricultural Productivity.
– World Bank (2022). Agriculture and Rural Development in South Asia.
– Bangladesh Bureau of Statistics (2023). Agricultural Statistics of Bangladesh.
– Bangladesh Planning Commission (2022). Perspective Plan of Bangladesh 2041.