বিশাল কাঁচের দেয়ালঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষ। বাইরে গোধূলির আলোটা শহরের ধূসর দালানগুলোর গায়ে লেগে কেমন ম্লান দেখাচ্ছে। ষাট বছর বয়সী ফরহাদ সাহেব রিভলভিং চেয়ারে বসে ফাইল দেখছেন না, বরং তাকিয়ে আছেন দিগন্তের দিকে। যেখানে আকাশের নীল রঙটা ফিকে হয়ে আসছে, ঠিক যেমন ফিকে হয়ে এসেছে তাঁর ছোটবেলার সেই দিনগুলো।
এখন তিনি কর্পোরেট জগতের এক ব্যস্ত মানুষ, যাঁকে অন্যের জীবন ভালো করার গুরুদায়িত্ব সামলাতে হয়। কিন্তু তাঁর ভেতরের মানুষটি আজো সেই মেঠো পথের ধুলোবালিতে আটকে আছে। প্রবাদ আছে না— “বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”; তেমনি ফরহাদ সাহেবের মনে হয়, গ্রাম ছাড়া তাঁর অস্তিত্বটাই যেন শিকড়হীন এক বৃক্ষের মতো।
স্মৃতির জানালাটা খুললেই ভেসে আসে সেই ঝাপসা হয়ে যাওয়া বিকেলগুলো। স্কুলের ছুটির পর বন্ধুদের সাথে বাড়ির পথে রওনা হওয়া। রাস্তার দুপাশে ধানক্ষেত, বাতাসে দোল খাওয়া কাশবনের সেই ঘ্রাণ। সিনেমা দেখার গল্প থেকে শুরু করে কার বাবা কী আনলো—সব যেন ছিল মহাকাব্য। সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল সেই রাতের গল্প। পড়ার ফাঁকে লুকিয়ে চুরি করা নারকেল আর তাজা খেজুরের রস দিয়ে ফিন্নি রান্নার সেই স্বাদ! সেই অমৃত কি আর এই ফাইভ-স্টার হোটেলের ডেকোরেশনে পাওয়া যায়? “ক্ষিধে থাকলে নুন দিয়েও অমৃত লাগে”, তবে সেই বন্ধুদের সাহচর্যই ছিল আসল মশলা।
আজ সব ডিজিটাল। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্ধুদের ছবি ভাসে, কখনো হয়তো কলে কথা হয়। কিন্তু সেই মাটির সোঁদা গন্ধ কিংবা জ্যান্ত আড্ডার প্রাণশক্তি সেখানে অনুপস্থিত। কেউ হয়তো পরপারে পাড়ি জমিয়েছে, কেউ বা বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ। জীবন যে আসলে কী, কেন আর কোথায় বয়ে যায়—তা ভেবে ফরহাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। প্রবাদ আছে— “নদীর জল আর গত হওয়া দিন, কখনো ফিরে আসে না”।
বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে এসব গল্প যেন প্রাগৈতিহাসিক রূপকথা। তাদের জগত ল্যাপটপ, গেমিং আর সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্দি। তাদের গ্রামের মেঠো পথে হাঁটার সময় নেই, নেই সেই অহেতুক আনন্দের তৃষ্ণা। তারা ইতিহাস পড়ে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না।
ফরহাদ সাহেব মাঝে মাঝে ভাবেন, তিনি কি সত্যিই সফল? শহরের এই জৌলুস তাকে অর্থ দিয়েছে, প্রতিপত্তি দিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে তাঁর প্রিয় গ্রাম। শরীরটা এখানে দামী স্যুটে মোড়ানো থাকলেও মনটা আজো সেই খেজুর গাছের তলায় পড়ে আছে। “

“ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়”—শহরের এই কৃত্রিমতা তাঁকে মাঝে মাঝে বড্ড বেশি ক্লান্ত করে তোলে।
হয়তো বেঁচে থাকতে আর সেই শিকড়ে ফেরা হবে না। জীবিকা আর দায়িত্বের এই অদৃশ্য শিকল তাকে মুক্তি দেবে না। মনের গভীরে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার গুমরে মরে। তিনি জানেন, একদিন এই যান্ত্রিক জীবনের অবসান ঘটবে। তখন হয়তো আর কোনো বাধা থাকবে না। তাঁর নিথর দেহটা যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে সেই প্রিয় গাঁয়ের দিকে রওনা হবে, তখন হয়তো আকাশটা আবার সেই ছোটবেলার মতো নীল দেখাবে।
শেষমেষ “সব পাখিরই নীড়ে ফেরা হয়।”। ফরহাদ সাহেবের শেষ ইচ্ছা, তাঁর রক্ত-মাংসের শরীরটা যেন সেই মেঠো পথের পাশে, নিজের প্রিয় গ্রামের মাটিতেই মিশে যায়। যেখানে একসময় তিনি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতেন, সেখানেই যেন তাঁর শেষ বিশ্রাম হয়। জীবনের এই দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে মাটির মানুষ ফিরবে মাটির কাছেই—যেখানে স্মৃতিরা মরে না, শুধু মেঠো পথের ধুলো হয়ে বেঁচে থাকে।
জীবনের শুরু থেকে সমাপ্তি, মাঝে অনেকগুলো ঘটনার আর্বিভাব হয় জীবনের প্রতিটি স্তরে আনন্দ থাকে, বেদনা থাকে, ভালো লাগা থাকে, ভালো বাসা থাকে, কারো ভাগ্যে জৌলুসে ভরা জীবন,আবার কাহারো ভাগ্যে কষ্ট,অভাব,দারিদ্র,জঞ্জালে ভরা জীবন অতিবাহিত করতে হয় এটাই নিয়তির খেলা এটাই পৃথিবীর সৌন্দয্য। এরই মধ্যে ভালো লাগার ভালো থাকার রাস্তাটা খুঁজে নিতে হয়। গ্রামীন জীবনের যে স্বাদ সেটা আমাদের জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় তুমি হৃদয়ের গভীর থেকে সেটা উপলব্ধি করতে পার কারণ গ্রামের মেঠোপথ তোমাকে এখনো টানে যারা এর গন্ধ পায়নি তাদের কাছে রুপ কথার মতোই।
মনের আবেগ দিয়ে বাস্তব অনুভূতিটা উপস্থাপন করেছ, আমার অনুভূতির সাথে ১০০% মিলে গেছে অসঙ্খ্য ধন্যবাদ তোমাকে।
ধন্যবাদ বন্ধু