যদি তারে নাহি চিনি…
নীলম, একজন শহুরে কর্পোরেট মানুষ। সে ও অন্য সবার মত অনুভূতি প্রবন। কিন্তু জীবন তার চকে বাধাঁ। নিয়মের বাহিরে যাওয়া হয়ে উঠে না।
নীলম, একজন শহুরে কর্পোরেট মানুষ। সে ও অন্য সবার মত অনুভূতি প্রবন। কিন্তু জীবন তার চকে বাধাঁ। নিয়মের বাহিরে যাওয়া হয়ে উঠে না।
শহরের ব্যস্ততার মাঝে প্রতিদিন একই রুটিনে চলত নীলমের জীবন। অফিস, বাসা, আর মাঝে মাঝে বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া, এই ছিল তার ছোট্ট জগৎ। অনেক মানুষের ভিড়ে থেকেও সে যেন একা। এই একাকিত্ব সে অনুভব করে কিন্তু কিভাবে পুরণ হবে তা নিয়ে খুব ভাবা হয় না।
একদিন সন্ধ্যায়, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। মাথার উপর ছিল তার নিয়মিত ছাতা। হঠাৎ পাশেই ছাতাহীন এক মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটি হঠাৎ বৃষ্টিতে অপ্রস্তুত। তার চুল ভিজে কাঁধে লেগে আছে, চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। শরৎচন্দ্রের নায়িকার মত দেখতে। নিলমের তখনই পরোপকারী হতে মন চাইল। নিজের ছাতাটা একটু এগিয়ে দিল।
“আপনি ভিজে যাচ্ছেন, ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে, চাইলে… শেয়ার করতে পারেন,” একটু দ্বিধায় বলল নীলম।
মেয়েটি হতচকিত হলো, মৃদু হেসে বলল, “ধন্যবাদ… আমি মৃন্ময়ী।”
সেই প্রথম পরিচয়।
তারপর থেকে প্রতিদিন একই সময়ে, একই জায়গায় তাদের দেখা হতে লাগল কিন্তু সিডিউল করে নয়। এটা কাকতালীয়ও হতে পারে অথবা দুই মনের ভালো লাগাও হতে পারে। কখনো চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে গল্প, কখনো শুধু নীরবতায় পাশাপাশি হাঁটা।
নীলম বুঝতে পারছিল, তার সময় একটু অন্যরকম কাটছে। একটু ভালো লাগা কাজ করছে। নিজের সাথে মেয়েটিকে সম্পর্কিত অনুভব করছিল। এই মেয়েটি তার জীবনে ধীরে ধীরে এক বিশেষ জায়গা করে নিচ্ছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মৃন্ময়ী কখনো নিজের সম্পর্কে তেমন কিছু বলত না। সে কোথায় থাকে, কী করে, তার কে কে আছে, সবই যেন রহস্যের আড়ালে। এক স্বর্গমানবী যেন। কারও সাথে তার কোনই যোগাযোগ নেই।
একদিন নীলম সংকোচ ভেঙে বলেই ফেলল,
“তোমাকে আমি চিনি না… তবুও কেন মনে হয় তুমি আমার খুব কাছের?”
মৃন্ময়ী একটু থেমে মৃদু হেসে বলল,
“সব মানুষকে জানার দরকার হয় না, কিছু মানুষকে শুধু অনুভব করলেই হয়।” নীলম একথা শুনল, কিন্তু মনে জায়গা দিল না। তার মৃন্ময়ী সম্বন্ধে জানার আগ্রহ আরও প্রবল হলো। একদিন অফিসে বসেই ঠিক করল, আজ তাকে মৃন্ময়ী সম্বন্ধে জানতেই হবে।
নীলম অফিস থেকে একটু আগে বের হয়ে নিদিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু এই অপেক্ষার আর শেষ হলো না। সেই দিন থেকেই মৃন্ময়ী আসা বন্ধ করে দিল। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, কিন্তু তার দেখা আর মেলে না।
নীলম প্রতিদিন সেই নিদিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টির দিন এলে তার বুকটা একটু বেশি হাহাকার করে। এই বৃষ্টির দিনে মৃন্ময়ীকে প্রথম পাওয়া।
একদিন, পুরনো এক চায়ের দোকানদারের কাছে নীলম জানতে পারল, মৃন্ময়ী নাকি অন্য শহরে চলে গেছে, হঠাৎই। এর বেশি কিছু চা দোকানদারও জানত না।
নীলম চুপ করে রইল।
সেই রাতে বাসায় ফিরে নীলম ডায়েরিতে লিখল,
“যদি তারে নাহি চিনি, তবুও কেন মনে হয় সে-ই আমার জীবন গল্পের সবচেয়ে সত্য অংশ?”
সময় চলে যায়। জীবন আবার স্বাভাবিক হয়। মাঝে মাঝে বৃষ্টিও নামে, নীলম আজও ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, হয়তো আবার কোনো একদিন, হঠাৎ করেই মৃন্ময়ীর সাথে দেখা হয়ে যাবে।
কারণ কিছু গল্প শেষ হয় না… শুধু থেমে থাকে।
