Blogs & Stories

পর্ব-৫: তারল্য ঝুঁকি (Liquidity Risk): ব্যাংকের আস্থা, স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি

ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। আমানতকারীরা বিশ্বাস করেন যে প্রয়োজনে তারা যেকোনো সময় তাদের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। এই বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা দ্রুত নগদে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ থাকা অপরিহার্য। এই সক্ষমতাই তারল্য (Liquidity), আর এই সক্ষমতা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনাই Liquidity Risk বা তারল্য ঝুঁকি।

ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। আমানতকারীরা বিশ্বাস করেন যে প্রয়োজনে তারা যেকোনো সময় তাদের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। এই বিশ্বাস ধরে রাখার জন্য ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা দ্রুত নগদে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ থাকা অপরিহার্য। এই সক্ষমতাই তারল্য (Liquidity), আর এই সক্ষমতা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনাই Liquidity Risk বা তারল্য ঝুঁকি।
বর্তমান বিশ্বে ব্যাংকের পতনের অন্যতম কারণ শুধু ঋণখেলাপি নয়, বরং আকস্মিক তারল্য সংকটও একটি বড় কারণ। ২০২৩ সালে বিশ্বের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাংকের সংকট দেখিয়েছে যে, পর্যাপ্ত মূলধন থাকা সত্ত্বেও তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা একটি ব্যাংককে দ্রুত বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
Liquidity Risk হলো এমন একটি ঝুঁকি, যেখানে একটি ব্যাংক সময়মতো এবং গ্রহণযোগ্য ব্যয়ে তার আর্থিক দায় (Financial Obligations) পরিশোধ করতে ব্যর্থ হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের সম্পদ থাকলেও তা যদি দ্রুত নগদে রূপান্তর করা না যায় অথবা অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়া অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব না হয়, তাহলে তারল্য ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
Liquidity Risk সাধারণত দুই ধরনের, এক, Funding Liquidity Risk অর্থাৎ আমানত উত্তোলন, ঋণ বিতরণ বা অন্যান্য দায় পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের অভাব।
দুই, Market Liquidity Risk অর্থাৎ সম্পদ বিক্রি করতে গিয়ে বাজারে ক্রেতা না পাওয়া অথবা প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া।
Liquidity Risk কেন গুরুত্বপূর্ণ, এটা বলতে গেলে বুঝতে হবে যে, ব্যাংকিংয়ে লাভের আগে টিকে থাকা জরুরি। একটি ব্যাংক লাভজনক হলেও যদি সময়মতো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারে, তাহলে বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, আমানত প্রত্যাহার বেড়ে যায় এবং পরিস্থিতি দ্রুত ব্যাংক-রানে (Bank Run) রূপ নিতে পারে।
সুষ্ঠু তারল্য ব্যবস্থাপনা আমানতকারীদের আস্থা বজায় রাখে, ব্যাংকের সুনাম রক্ষা করে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার আস্থা বৃদ্ধি করে, ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে, এবং সংকটকালেও ঋণ বিতরণ ও পেমেন্ট ব্যবস্থা সচল রাখে।
Liquidity Risk-এর প্রধান কারণগুলোর পেছনে যে কারণগুলো কাজ করে সেগুলোর মধ্যে আকস্মিক আমানত উত্তোলন, স্বল্পমেয়াদি আমানতের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, দীর্ঘমেয়াদি ঋণে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, সম্পদ-দায়ের (Asset-Liability) মেয়াদের অসামঞ্জস্য, বাজারে অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়া, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক তথ্যের দ্রুত বিস্তার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন ইত্যাদি অন্যতম।
একটা ব্যাংক যদি তারল্য ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে আমানতকারীদের আস্থা কমে যায়, ব্যাংকের অর্থায়নের ব্যয় বেড়ে যায়, সম্পদ কম মূল্যে বিক্রি করতে হয়, ব্যাংকের লাভজনকতা হ্রাস পায়, ক্রেডিট রেটিং অবনতি ঘটে, নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়, এবং চরম অবস্থায় ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে, Liquidity Risk মোকাবিলার জন্য যদি নিন্মলিখিত কৌশল সমূহ, যাহা আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত, নেয়া যায়, তারল্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়, যেমন-
⁃ শক্তিশালী Asset-Liability Management (ALM) সম্পদ ও দায়ের মেয়াদ, সুদের হার এবং নগদ প্রবাহের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে।
⁃ পর্যাপ্ত High Quality Liquid Assets (HQLA) যেমন সরকারি সিকিউরিটিজ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ সংরক্ষণ এবং দ্রুত নগদায়নযোগ্য সম্পদ ধরে রাখা ইত্যাদি তারল্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
⁃ Liquidity Coverage Ratio (LCR) ভালভাবে সংরক্ষণ যথা, ৩০ দিনের সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত উচ্চমানের তারল্যসম্পদ বজায় রাখা।
⁃ Net Stable Funding Ratio (NSFR) দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করে।
⁃ Stress Testing এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংকট পরিস্থিতিতে নিয়মিত তারল্য পরীক্ষা করতে সাহায্য করে।
⁃ Contingency Funding Plan (CFP) গ্রহণ করে জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প অর্থায়নের পূর্বপ্রস্তুত পরিকল্পনা রাখা।
⁃ Diversified Funding Sources ঠিক রেখে একক উৎসের পরিবর্তে আমানত, আন্তঃব্যাংক বাজার, বন্ড এবং অন্যান্য উৎসের সমন্বিত ব্যবহারের ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে Liquidity Risk একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ব্যাংকে আমানত প্রত্যাহারের চাপ, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ এবং বাজারে আস্থার পরিবর্তনের কারণে তারল্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে Basel III-এর আলোকে Liquidity Coverage Ratio (LCR) এবং Net Stable Funding Ratio (NSFR) বাস্তবায়ন করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত Stress Testing, Liquidity Gap Analysis, Asset Liability Committee (ALCO) সভা এবং Contingency Funding Plan প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং রিয়েল-টাইম পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে আমানত স্থানান্তর অনেক দ্রুত হচ্ছে। ফলে Liquidity Risk এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গতিশীল এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাপনার দাবি রাখে।
তবে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত Liquidity Analytics ব্যবহার করতে হবে, AI ও Data Analytics-ভিত্তিক Cash Flow Forecasting চালু করতে হবে, Deposit Concentration Risk কমাতে হবে, Stable Retail Deposit বৃদ্ধি করতে হবে, নিয়মিত Board ও Risk Management Committee-তে Liquidity Dashboard উপস্থাপন করতে হবে, Basel III ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, এবং ALCO-এর সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, Liquidity Risk কেবল একটি আর্থিক সূচক নয়, এটি একটি ব্যাংকের অস্তিত্ব, সুনাম এবং গ্রাহকের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি ব্যাংক লাভের ঘাটতি কিছু সময় সহ্য করতে পারে, কিন্তু তারল্যের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। তাই আধুনিক ব্যাংকিংয়ে কার্যকর Liquidity Risk Management এর কোনো বিকল্প নাই, এটি সুদৃঢ় সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।
উক্তি: “Profit keeps a bank growing, but liquidity keeps a bank alive.”

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button