Blogs & Stories

পর্ব-৩: ক্রেডিট রিস্ক: ব্যাংকের লাভ-লোকসানের সবচেয়ে বড় নির্ধারক

ব্যাংকের প্রধান কাজ হলো আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিতরণ করা। কিন্তু ঋণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়—ক্রেডিট রিস্ক (Credit Risk)। সহজ ভাষায়, ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে মূলধন বা সুদ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই হলো ক্রেডিট রিস্ক।

ব্যাংকের প্রধান কাজ হলো আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিতরণ করা। কিন্তু ঋণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়—ক্রেডিট রিস্ক (Credit Risk)। সহজ ভাষায়, ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে মূলধন বা সুদ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই হলো ক্রেডিট রিস্ক।
আজকের বিশ্বে ব্যাংকের সফলতা শুধু কত ঋণ বিতরণ করেছে তার ওপর নির্ভর করে না; বরং কত নিরাপদভাবে ঋণ দিয়েছে এবং সেই ঋণ কতটা আদায় করতে পেরেছে, সেটিই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং সংকট—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্বল ক্রেডিট রিস্ক ব্যবস্থাপনা ছিল অন্যতম প্রধান কারণ।
একটি বাস্তবধর্মী উদাহরণ হলো-
ধরা যাক, একটি ব্যাংক একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করল। তবে, শর্ত হলো, প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করবে এবং ব্যাংক লাভবান হবে। কিন্তু যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরী পোশাকের চাহিদা কমে যায়, রপ্তানি আদেশ বাতিল হয় বা প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ সংকুচিত হয়, তাহলে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ঝুঁকি তৈরি হবে। এই অবস্থায় ব্যাংককে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হতে পারে, মুনাফা কমে যেতে পারে এবং মূলধনের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এটিই ক্রেডিট রিস্কের বাস্তব প্রভাব।
কেন ক্রেডিট রিস্ক গুরুত্বপূর্ণ?
একটি ব্যাংকের মোট ঝুঁকির মধ্যে সাধারণত ক্রেডিট রিস্কই সবচেয়ে বড়। এটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে:
⁃ খেলাপি ঋণ (NPL) বৃদ্ধি পাবে;
⁃ ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে;
⁃ মূলধনের পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy) দুর্বল হবে;
⁃ বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা কমে যাবে; এবং
⁃ পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে কীভাবে ক্রেডিট রিস্ক নিয়ন্ত্রণ করা হয়?
পৃথিবীর আধুনিক ব্যাংকগুলো শুধু জামানতের ওপর নির্ভর করে ঋণ মূল্যায়ন করে না। তারা গ্রাহকদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে। এই মূল্যায়নের মধ্যে রয়েছে—
⁃ ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা ও নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ।
⁃ ব্যবসার প্রকৃতি ও শিল্পখাতের ঝুঁকি মূল্যায়ন।
⁃ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও সুনাম যাচাই।
⁃ নিয়মিত ঋণ পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা (Early Warning Signals)।
⁃ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যেমন Basel Framework এবং IFRS 9 অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য আগাম প্রভিশন রাখা।
ভালো ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্টের বৈশিষ্ট্য হলো, একটি শক্তিশালী ব্যাংক কখনোই শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয় না। বরং সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণের গুণগত মান বজায় রাখে। এই সংস্কৃতিই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মুনাফা নিশ্চিত করে।
ব্যাংকিংয়ে একটি প্রচলিত কথা আছে, “Good lending is not about giving more loans, it is about giving the right loans to the right borrowers.” অর্থাৎ, বেশি ঋণ দেওয়া নয়, বরং সঠিক গ্রাহককে সঠিক শর্তে ঋণ দেওয়াই একটি সফল ব্যাংকের এবং ব্যাংকারের পরিচয়।
তবে, ক্রেডিট রিস্ক কখনো পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে এটিকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখা সম্ভব। আর সেখানেই নিহিত রয়েছে একটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সাফল্যের ভিত্তি।

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button