Blogs & Stories

মায়ের জীবনের উদ্দেশ্য

মা যে একজন মানুষ ছিলেন, তাঁরও যে স্বপ্ন থাকতে পারে, কষ্ট থাকতে পারে, অপূর্ণতা থাকতে পারে—সেটা কখনো ভাবিনি।

মায়ের জীবনের উদ্দেশ্য

২০০৪ সাল।

সেদিন মা চলে গেলেন।

কেউ খুব একটা বুঝতে পারেনি—কখন তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অন্য এক জগতে চলে গেলেন। কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো বিদায়বেলা ছিল না, কাউকে কষ্ট দেওয়ারও যেন তাঁর স্বভাবে ছিল না।

তিনি সারাজীবন যেমন নীরবে সংসার করেছেন, তেমনি নীরবেই চলে গেলেন।

কিন্তু আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—

মায়ের জীবনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

ছোটবেলায় এই প্রশ্নের কোনো অর্থই বুঝিনি।

তখন মা মানেই ছিল ঘরের একজন মানুষ। ভোর হলে উঠবেন, রান্না করবেন, আমাদের খাওয়াবেন, কাপড় ধুয়ে দেবেন, অসুখ হলে মাথায় পানি দেবেন, আর সন্ধ্যায় আমরা বাড়ি ফিরলে জিজ্ঞেস করবেন—

“খেয়েছিস?”

মা যে একজন মানুষ ছিলেন, তাঁরও যে স্বপ্ন থাকতে পারে, কষ্ট থাকতে পারে, অপূর্ণতা থাকতে পারে—সেটা কখনো ভাবিনি।

আজ ভাবি।

মা ছিলেন একেবারে সহজ-সরল গ্রামের মেয়ে।

তাঁর বাবা একজন পাত্র দেখে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। মা এসেছিলেন আমার বাবার ঘরে। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ।

কিন্তু মা কোনোদিন অভিযোগ করেননি।

খুশি মনে সংসার করেছেন।

আমরা ছিলাম পাঁচ ভাই ও দুই বোন।

সাতটি সন্তান।

একটি মায়ের জন্য সাতটি পৃথিবী।

আমাদের কারও জ্বর হলে মায়ের রাত জেগে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক। কারও জামা ছিঁড়ে গেলে সেটি সেলাই করে দেওয়া ছিল স্বাভাবিক। কেউ ক্ষুধার্ত থাকলে নিজের অংশটুকু সরিয়ে রাখা ছিল স্বাভাবিক।

তখন বুঝিনি—

মায়ের কাছে নিজের জন্য কিছু রাখা যেন স্বাভাবিকের মধ্যেই পড়ত না।

তারপর এল ১৯৭১।

স্বাধীনতা যুদ্ধ।

একদিন আমাদের যা ছিল, সব যেন এক ঝড়ে উড়ে গেল।

পাকা বাড়ি ছিল।

গোয়ালভরা গরু ছিল।

গোলাভরা ধান ছিল।

জমিজমা ছিল।

একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার মতো অনেক কিছুই ছিল।

তারপর যুদ্ধ এল।

আর যুদ্ধ শুধু মানুষকে হত্যা করে না।

যুদ্ধ কখনো কখনো একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, নিরাপত্তা, স্বপ্ন—সবকিছুকেও হত্যা করে।

যুদ্ধের পর আমরা প্রায় সব হারালাম।

বাবা জমি বিক্রি করে সংসার চালাতে লাগলেন।

বড় ভাই ব্যবসা করলেন। ক্ষতি হলো।

বাবা জমি বিক্রি করে সেই ক্ষতি শোধ করলেন।

আবার ক্ষতি।

আবার জমি বিক্রি।

একসময় বুঝতে পারলাম—

জমি আর নেই।

যে জমি ছিল আমাদের ভবিষ্যৎ, সেটিও শেষ।

বাবা ছিলেন সহজ-সরল মানুষ। সন্তানদের কোনো আবদার তিনি ফিরিয়ে দিতে পারতেন না।

কেউ ভুল করলেও বাবা তার দায় নিতেন।

কেউ ক্ষতি করলেও বাবা সেই ক্ষতি নিজের কাঁধে তুলে নিতেন।

এভাবেই একদিন পরিবারের সম্পদ শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু সন্তানদের দায়িত্ব শেষ হলো না।

বড় ভাই তাঁর নিজের জীবনের টানাপোড়েনে পরিবারকে তেমনভাবে এগিয়ে নিতে পারলেন না। বরং তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত পরিবারের জন্য আরও ক্ষতি নিয়ে এল।

আরেক বড় ভাইও পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে গেলেন।

তিন বড় ভাই বিয়ে করে নিজেদের সংসারে চলে গেলেন।

তাঁদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

কিন্তু আমাদের পরিবারের পুরোনো অধ্যায় তখনও শেষ হয়নি।

তখন বাবা ছিলেন না।

জমি ছিল না।

নিরাপত্তা ছিল না।

ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

ছিল শুধু—

মা।

সেদিন হয়তো মা নিজেও জানতেন না, তিনি কী হয়ে উঠতে যাচ্ছেন।

তিনি হয়ে উঠলেন আমাদের পরিবারের মেরুদণ্ড।

সবজি চাষ করলেন।

বাঁশের কাজ করলেন।

হাতের কাজ করলেন।

ধান থেকে চাল করলেন।

চাল বিক্রি করলেন।

যে কাজ সামনে পেয়েছেন, করেছেন।

কাজটি ছোট কি বড়—সে হিসাব করেননি।

কারণ তাঁর কাছে তখন কাজের মর্যাদা নয়,

সন্তানদের ভবিষ্যৎটাই ছিল বড়।

ভোরে সূর্য ওঠার আগে যে নারী মাঠে যেতেন, তিনি শুধু সবজি ফলাতেন না।

তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ ফলাতেন।

ধান থেকে চাল বানিয়ে যে নারী বাজারে বিক্রি করতেন, তিনি শুধু চাল বিক্রি করতেন না।

তিনি আমাদের স্বপ্নের জন্য টাকা জমাতেন।

বাঁশের কাজ করতে করতে যে হাত শক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই হাতই একদিন আমাদের মাথায় স্নেহের হাত রেখেছিল।

মায়ের হাতের রেখাগুলো হয়তো তখন মুছে যাচ্ছিল।

কিন্তু আমাদের জীবনের রেখাগুলো তিনি ধীরে ধীরে স্পষ্ট করে দিচ্ছিলেন।

এর মধ্যে বড় ভাইয়েরা নিজেদের সংসার গুছিয়ে নিলেন।

তাঁদের দায়িত্ব শেষ হলো।

কিন্তু মায়ের দায়িত্ব শেষ হলো না।

কারণ মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না।

সন্তান চল্লিশ বছরের হলেও মা তাকে দেখেন সেই ছোট্ট শিশুটির মতো—যে একদিন তাঁর আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।

আমি আর আমার আরেক ভাই পড়াশোনা করলাম।

আমার সেই ভাই কলেজের শিক্ষক হলেন।

আমারও জীবন গড়ে উঠল।

আমরা মানুষ হলাম।

মা খুশি হলেন।

হয়তো কারও কাছে এইটুকুই তাঁর জীবনের সাফল্য।

কিন্তু আজ এত বছর পরে আমার মনে অন্য একটি প্রশ্ন জাগে—

মা নিজে কী পেলেন?

কখনো কি মা হিসাব করেছিলেন—

আমি কতটা দিলাম?

আমার জন্য কী রইল?

আমার স্বপ্ন কী ছিল?

আমার জীবনে কী হলো?

না।

মা কোনোদিন নিজের জীবনকে হিসাবের খাতায় আনেননি।

আমরা হিসাব করেছি।

মা করেননি।

আমরা ভেবেছি—মা তো আছেন।

মা ভেবেছেন—আমরা যেন ভালো থাকি।

এটাই ছিল তাঁর পৃথিবী।

তারপর একদিন—

২০০৪ সাল।

মা চলে গেলেন।

সবার অজান্তে।

কাউকে কোনো কষ্ট না দিয়ে।

কোনো অভিযোগ না রেখে।

কোনো পাওনা দাবি না করে।

যেন তিনি এসেছিলেনও নীরবে, চলে গেলেনও নীরবে।

শুধু আমাদের জীবনের এক বিশাল জায়গা খালি করে দিয়ে।

আজ এত বছর পরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি—

মায়ের জীবনের উদ্দেশ্য হয়তো কোনো বড় বইয়ে লেখা ছিল না।

কোনো পুরস্কারের মঞ্চে ঘোষণা করা হয়নি।

কোনো ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম ওঠেনি।

কিন্তু তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ছিল—

আমাদের মানুষ করা।

তিনি নিজের জীবনকে আমাদের জীবনের ভিত বানিয়েছিলেন।

একজন মা কখনো কখনো নিজের জন্য কোনো ঘর তৈরি করেন না।

তিনি সন্তানের জন্য ঘর তৈরি করেন।

নিজের জন্য কোনো স্বপ্ন জমিয়ে রাখেন না।

সন্তানের স্বপ্নের মধ্যে নিজের স্বপ্ন রেখে দেন।

নিজের ক্ষুধাকে ভুলে যান সন্তানের ক্ষুধার কাছে।

নিজের ক্লান্তিকে ভুলে যান সন্তানের ভবিষ্যতের কাছে।

আর আশ্চর্যের বিষয়—

এর বিনিময়ে তিনি কিছুই চান না।

না টাকা।

না সম্পদ।

না সম্মান।

শুধু চান—

“আমার সন্তানগুলো ভালো থাকুক।”

আজ বুঝি, পৃথিবীতে এমন মায়ের সংখ্যা কোটি কোটি।

তাঁদের নাম ইতিহাসে লেখা হয় না।

তাঁদের জীবনী প্রকাশিত হয় না।

তাঁদের ছবি কোনো দেয়ালে ঝোলে না।

কিন্তু তাঁদের হাতেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজটি সম্পন্ন হয়—

একটি মানুষকে মানুষ করে তোলা।

মা,

তুমি চলে গেছ অনেক বছর।

কিন্তু তোমার ছায়া এখনও আমাদের ঘিরে আছে।

আমরা যখন ভালো কিছু করি, মনে হয় তুমি হয়তো দূর থেকে হাসছ।

আমরা যখন ভুল করি, মনে হয় তুমি হয়তো আগের মতোই বলছ—

“সাবধানে চলিস।”

আজ আমার খুব মায়া হচ্ছে, মা।

বড্ড মায়া।

ভাবি, তুমি এত কিছু করলে আমাদের জন্য।

কিন্তু আমরা কি কোনোদিন তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—

“মা, তুমি কেমন আছ?”

হয়তো করিনি।

আমরা সন্তানরা এমনই।

মায়ের ভালোবাসাকে এতটাই স্বাভাবিক ধরে নিই যে, তার মূল্য বুঝতে বুঝতেই একদিন মা আর কাছে থাকেন না।

মা,

তুমি যেখানেই থাকো,

ভালো থেকো।

যদি পরকাল সত্যিই এমন একটি জায়গা হয় যেখানে মানুষের সব কষ্টের হিসাব মুছে যায়, তবে তোমার জন্য সেখানে নিশ্চয়ই শান্তির একটি ঘর আছে।

কারণ তুমি পৃথিবীতে নিজের জন্য কিছু চাওনি।

তুমি শুধু দিয়েছ।

তোমার সাত সন্তানের জীবন দিয়ে তুমি তোমার জীবনের অর্থ লিখে গেছ।

আজ বুঝি—

মায়ের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল না নিজের জন্য বেঁচে থাকা।

মায়ের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল—আমাদের বাঁচিয়ে তোলা।

মা, আমার মা।

আমাদের মা।

তুমি যেখানেই থাকো—

ভালো থেকো।

আর পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুন।

তোমাদের জন্যই তো আমরা ভালো আছি।

হয়তো সবসময় তোমাদের ভালো রাখতে পারি না।

হয়তো আমাদের আচরণে তোমরা কষ্ট পাও।

তবু তোমরা ক্ষমা করে দিও।

কারণ—

মায়েরা এমনই।

তাঁরা সন্তানকে ক্ষমা করতে করতে একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

আর সন্তান তখন অনেক দেরিতে বুঝতে পারে—

যে মানুষটিকে সে সারাজীবন “মা” বলে ডেকেছে, সে আসলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল।

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button