ছোটবেলার ঘুম
ছোটবেলায় আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—আমি ছিলাম ভীষণ ঘুমকাতুরে। বই খুললেই চোখ জড়িয়ে আসত। গৃহশিক্ষক যতই ধমক দিতেন, “পড়ার সময়ও কি কেউ ঘুমায়?”, ততই যেন ঘুম আরও গভীর হতো। অনেক দিন বইয়ের ওপর মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছি।
মজার ব্যাপার হলো, শুধু পড়ার সময় নয়—নামাজ পড়তে গিয়েও কখনো কখনো চোখ বুজে আসত। খেতে বসে, এমনকি হাঁটতে হাঁটতেও ঘুমে ঢুলে পড়তাম। পরিবারের সবাই বলতেন, “এ ছেলে বুঝি ঘুম নিয়েই পৃথিবীতে এসেছে!”
কিন্তু আশ্চর্য এক ব্যাপার ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে নামলেই সেই ঘুম কোথায় যেন উধাও হয়ে যেত। বিকেলের মাঠ, ধুলোমাখা বাতাস, আর হাডুডুর ডাক—“হাডুডু… হাডুডু…”—শুনলেই শরীরে যেন নতুন প্রাণ ফিরে আসত।
আমাদের হাডুডুর খেলাগুলো ছিল অন্য রকম। কোনো নির্দিষ্ট বাউন্ডারি ছিল না। পুরো গ্রামটাই যেন ছিল আমাদের মাঠ। খেলার ফাঁকে কেউ একজন মজা করে দৌড় দিতে দিতে অনেক দূরে চলে যেত। কখনো দেখা যেত, সে একটা গাছের নিচে, কিংবা খড়ের গাদার পাশে গিয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছে! আমরা সবাই তাকে খুঁজতে বের হতাম—কোথায় গেল? শেষে খুঁজে পেয়ে হাসতে হাসতে বলতাম, “খেলা ছেড়ে ঘুমাতে এসেছিস?”
সেই দিনগুলোতে ছিল না মোবাইল, ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ছিল শুধু বন্ধু, মাঠ, হাসি, দুষ্টুমি আর অফুরন্ত শৈশব। ছোট ছোট ঘটনাগুলো তখন খুব সাধারণ মনে হতো, অথচ আজ সেগুলোই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।
আজ আমরা সবাই বড় হয়েছি। কেউ ব্যাংকার, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ বিদেশে। জীবনের ব্যস্ততায় হয়তো আর হাডুডু খেলা হয় না, বন্ধুরা একসঙ্গে মাঠেও জড়ো হয় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে চোখ বন্ধ করলেই সেই ধুলোমাখা বিকেল, সেই দৌড়, সেই হাসি আর সেই ঘুমকাতুরে দিনগুলো আবার ফিরে আসে।
নস্টালজিয়া হয়তো এটাই—যে সময়টায় ফিরে যাওয়া যায় না, কিন্তু যেটা কখনো মন থেকে মুছে যায় না।
তোমাদের ছোটবেলাও কি এমন ছিল? তোমরাও কি কখনো খেলতে খেলতে হারিয়ে গিয়ে কোথাও ঘুমিয়ে পড়েছিলে? কিংবা এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা মনে পড়লেই আজও অজান্তে মুখে হাসি ফুটে ওঠে?