জীবনের যতকথাবাংলা ব্লগ

“নক্ষত্রবাড়ির শেষ প্রদীপ”

গ্রামের ছেলেরা নানা গল্প বানাতো। কেউ বলত, বাড়িতে গুপ্তধন আছে। কেউ বলত, বৃদ্ধ লোকটি জাদুকর। কিন্তু সত্যটা কেউ জানত না।

বাংলার এক অজ পল্লীতে ছিল একটি পুরোনো বাড়ি। গ্রামের মানুষ সেটিকে ডাকত “নক্ষত্রবাড়ি” নামে। কারণ, গভীর রাতে বাড়িটির ভাঙা জানালা দিয়ে নীলচে আলো বের হতো, যেন আকাশের তারা নেমে এসেছে।

বাড়িটিতে থাকতেন বৃদ্ধ এক মানুষ, মঈনুদ্দিন সাহেব। তাঁর ছিল না কোনো সন্তান, না কোনো আত্মীয়। তিনি দিনের বেলায় খুব কম বের হতেন, কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় উঠোনের মাঝখানে একটি প্রদীপ জ্বালাতেন। আশ্চর্যের বিষয়, ঝড়-বৃষ্টি কিছুতেই সেই প্রদীপ নিভত না।

গ্রামের ছেলেরা নানা গল্প বানাতো। কেউ বলত, বাড়িতে গুপ্তধন আছে। কেউ বলত, বৃদ্ধ লোকটি জাদুকর। কিন্তু সত্যটা কেউ জানত না।

একদিন গ্রামের দরিদ্র কিশোর আরিব সিদ্ধান্ত নিল, সে রহস্য জানবেই। তার মা অসুস্থ, ওষুধ কেনার টাকা নেই। সে ভাবল, যদি সত্যিই গুপ্তধন থাকে!

সেই রাতে সে চুপিচুপি নক্ষত্রবাড়িতে ঢুকল। বাড়ির ভেতরটা অদ্ভুত নীরব। দেয়ালে পুরোনো ঘড়ি, ধুলো জমা বই, আর অসংখ্য হাতের লেখা চিঠি।

হঠাৎ পেছন থেকে কণ্ঠ শোনা গেল,
“ধন খুঁজতে এসেছ?”

আরিব ভয় পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। মঈনুদ্দিন সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন এক মায়া ভরা চোখ নিয়ে কিন্তু তাঁর চোখে রাগ নেই।

তিনি আরিবকে যত্ন করলেন, একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। বসতে দিলেন, খেতে দিলেন। ঘরের মাঝখানে ছিল ছোট্ট কাঠের বাক্স। আরিবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিন্তু বাক্স খুলে সে হতবাক।
ভেতরে সোনা-রূপা কিছুই নেই। আছে শত শত চিঠি।
বৃদ্ধ বললেন,
“এগুলো মানুষের অপূর্ণ স্বপ্ন। স্বপ্ন ভাঙ্গা মানুষের স্বপ্নের সম্ভার। কেউ ডাক্তার হতে চেয়েছিল, কেউ কবি, কেউ শিক্ষক। কিন্তু পারেননি। অভাব স্বপ্ন পুরন হতে দেয়নি। অভাব ছিল প্রতিযোগিতার। সেই স্বপ্ন ভাঙ্গা মানুষগুলো তাদের কষ্ট আমাকে লিখে দিত।”

আরিব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে প্রদীপ?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “যতদিন মানুষের স্বপ্ন বেঁচে থাকে, ততদিন আলো নিভে না। স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”

সেই রাতেই মঈনুদ্দিন সাহেব আরিবকে কিছু টাকা দিলেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু শর্ত রাখলেন,
“একদিন তুমি বড় হবে, তখন কারও স্বপ্ন নিভতে দেবে না।”

বছর কেটে গেল। আবির বড় হলো, এই স্বপ্ন নিয়ে যে কারো স্বপ্ন নিভতে দেবে না।

সে গ্রামের পাশে একটি স্কুল গড়ে তুলেছিল, নাম তার “নক্ষত্রবিদ্যালয়”।
দরজার ওপরে লেখা ছিল:
“একটি প্রদীপ হাজার অন্ধকারকে আলোকিত করতে পারে।”

লোকেরা জানত না, সেই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আরিব প্রতি সন্ধ্যায় একটি প্রদীপ জ্বালায়। আর আশ্চর্যভাবে, আজও ঝড়-বৃষ্টিতে সেটি নিভে না।

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button