জীবনের গল্পগুচ্ছবাংলা ব্লগ

“সময়, সঙ্গ আর এক রিকশার গল্প”

এই রিকশার গল্প মানুষকে তিনটি জিনিস শিখায়-- সময়কে মূল্য দিন, যাদের সাথে আছেন, তাদের জন্য সময় বের করুন। পরে নয়—এখনই। সম্পর্ককে যত্ন করুন, শুধু কথা নয়, বাস্তব সংযোগ তৈরি করুন—ঠিকানা, খোঁজখবর, উপস্থিতি। ছোট মুহূর্তকে অবহেলা করবেন না, জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ অনেক সময় ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে।

সকালটা আজও আগের মতোই শুরু হয়, রাস্তায় মানুষের ভিড়, অফিসমুখী তাড়াহুড়া, আর আমার হাতে সেই পুরোনো ব্যাগটা। সবকিছু ঠিক আগের মতোই, শুধু একটা জিনিস বদলে গেছে, আমি এখন একা।

একটা সময় এই পথটা একা ছিল না।
বত্রিশ বছর আগের কথা। আমি তখন নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছি। অফিসে যাওয়ার তাড়া, কিন্তু রিকশা পাচ্ছি না। হঠাৎ পেছন থেকে একটি কণ্ঠ—
“সচিবালয়ে যাবেন? আসুন, একসাথে যাই।”

আমি তাকালাম। এক ভদ্রলোক, মুখে হাসি, চোখে আন্তরিকতা। সেই মুহূর্তে বুঝিনি, এই সাধারণ ডাকটাই আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং গভীর সম্পর্কের সূচনা হয়ে উঠবে।
আমাদের রিকশা যাত্রা শুধু অফিসে যাওয়া-আসা ছিল না, ছিল এক চলমান বিদ্যালয়।
তিনি প্রায়ই বলতেন—
“সময়কে কখনো হালকা ভাবে নেবেন না। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না, কিন্তু আমরা সময়কে নষ্ট করি।”

আমি হাসতাম, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম, তার প্রতিটি কথার ভেতরে একটা গভীর সত্য লুকিয়ে আছে।

রিকশায় বসেই আমরা দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতাম, পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতাম, জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ভাবতাম।
তিনি বলতেন—
“জীবনে বড় হতে হলে বড় পদ দরকার নেই, বড় মন দরকার।”
রিকশায় আমাদের সময়টা ছিল মাত্র ২০-২৫ মিনিট। কিন্তু সেই অল্প সময়টাই হয়ে উঠেছিল দিনের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।

আজ বুঝি—
জীবনের বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই আসে।
আমরা অনেক সময় ভাবি, “সময় আছে, পরে কথা বলবো, পরে দেখা করবো।”
কিন্তু “পরে” শব্দটাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো—আমরা কখনো একে অপরের বাড়ির ঠিকানা জানিনি।
কিন্তু তাতে কি?

তিনি আমার জীবনের এমন একজন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন, যার সাথে আমি নির্দ্বিধায় সব কথা বলতে পারতাম।সম্পর্কের গভীরতা পরিচয়ের দৈর্ঘ্যে নয়, আন্তরিকতার গভীরতায় নির্ভর করে।

আমরা দু’জনই মধ্যবিত্ত জীবনের মানুষ। সংসারের চাপ, অফিসের চাপ, সবই ছিল।
তবুও তিনি সবসময় একটা কথা বলতেন—
“সমস্যা থাকবেই, কিন্তু হাসি হারালে জীবনটাই হারাবেন।”
আমি অনেক সময় বিরক্ত হয়ে বলতাম—
“সবসময় হাসা যায় নাকি?”
তিনি বলতেন—
“না, সবসময় না। কিন্তু চেষ্টা করা যায়।”

বছর কেটে গেল। আমাদের চুল পেকে গেল, হাঁটার গতি কমে গেল।
কিন্তু আমাদের রিকশা যাত্রা থামেনি।
একদিন তিনি বললেন—
“দেখেন, আমরা কত বছর একসাথে চললাম, অথচ কখনো ভাবিনি এই সময়টা একদিন শেষ হবে।”
আমি হেসে বলেছিলাম—
“এখনও তো শেষ হয়নি!”
তিনি একটু চুপ করে ছিলেন।

আজ বুঝি—তিনি হয়তো তখনই সময়ের ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরেছিলেন।
এরপর, একদিন তিনি এলেন না।
ভাবলাম—হয়তো অসুস্থ।
দুইদিন, তিনদিন, তবুও এলেন না।
আমার ভেতরে একটা অজানা অস্থিরতা কাজ করতে লাগলো।

অপেক্ষা করছি দেখে পাশের দোকানদার বললেন—
“ভাই, উনি তো গত বৃহস্পতিবার রাতে মারা গেছেন।”

আমি নির্বাক।
বত্রিশ বছরের প্রতিদিনের সঙ্গী—
এক মুহূর্তে অতীত হয়ে গেল।
আমি তার বাড়ির ঠিকানা জানি না।
আমি তার পরিবারের কাউকে চিনি না।
আমি জানি না কোথায় গিয়ে তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাবো।

জীবনে যাদের সাথে সময় কাটান, তাদের প্রতি দায়িত্ব শুধু কথায় নয়—সম্পর্ককে বাস্তবেও ধরে রাখতে হয়। “একদিন সময় পাবো” এই ভাবনা অনেক সময় চিরতরে সুযোগ কেড়ে নেয়।

আজও আমি রিকশায় উঠি।
কিন্তু পাশের জায়গাটা ফাঁকা।
কেউ বলে না—
“আজকের খবর কি?”
কেউ জিজ্ঞেস করে না—
“মনে কি কষ্ট?”

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তিনি নেই, তবুও তার কথাগুলো রয়ে গেছে।
আজ আমি বুঝি—
সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
টাকা হারালে পাওয়া যায়,
পদ হারালে ফিরে পাওয়া যায়,
কিন্তু সময় একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না।

আমরা যারা প্রতিদিন ব্যস্ততায় ছুটছি—
আমরা কি সত্যিই সময়কে ব্যবহার করছি,
নাকি শুধু খরচ করছি?

এই রিকশার গল্প মানুষকে তিনটি জিনিস শিখায়–
সময়কে মূল্য দিন, যাদের সাথে আছেন, তাদের জন্য সময় বের করুন। পরে নয়—এখনই।
সম্পর্ককে যত্ন করুন, শুধু কথা নয়, বাস্তব সংযোগ তৈরি করুন—ঠিকানা, খোঁজখবর, উপস্থিতি।
ছোট মুহূর্তকে অবহেলা করবেন না, জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ অনেক সময় ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে।

আজ যখন একা রিকশায় বসি, মনে হয়—
জীবন আসলে একটা যাত্রা,
যেখানে কিছু মানুষ আসে,
কিছু মানুষ চলে যায়।
কিন্তু কিছু মানুষ এমন ছাপ রেখে যায়—
যা কখনো মুছে যায় না।

এখন আমি চেষ্টা করি—
যাদের সাথে আমার প্রতিদিন দেখা হয়,
তাদের সাথে একটু বেশি কথা বলতে,
তাদের খোঁজ নিতে,
তাদের মূল্য দিতে।
কারণ আমি জানি—
একদিন হয়তো তারা থাকবে না,
হয়ত আমিও থাকবো না।

সেদিনের সেই ডাক—
“সচিবালয়ে যাবেন? আসুন।”

এই একটি বাক্য আমাকে শিখিয়েছে—
জীবন কখনো বড় কিছু দিয়ে নয়, ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়েই তৈরি হয়। সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর সম্পর্ক—সেটাই জীবনের আসল সম্পদ।

আজও রিকশা চলে,
রাস্তা একই থাকে,
শহরও আগের মতোই ব্যস্ত—

কিন্তু আমি জানি,
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর যাত্রাটা
ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

হায়রে জীবন…
সময় থাকতেই যদি আমরা সময়কে বুঝতাম!

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button