জীবনের যতকথাবাংলা ব্লগ

যদি আমি সময়কেই লিখি…

যদি আমি সময়কেই লিখি, তবে আমাকে কোনো চরিত্র খুঁজতে হবে না। কারণ সময়ের চেয়ে বড় চরিত্র পৃথিবীতে আর একটি নেই। ধাবমান এক বিচিত্র মেশিন যা অধরা।

যদি আমি সময়কেই লিখি, তবে আমাকে কোনো চরিত্র খুঁজতে হবে না। কারণ সময়ের চেয়ে বড় চরিত্র পৃথিবীতে আর একটি নেই। ধাবমান এক বিচিত্র মেশিন যা অধরা।

অনেক সাধ, সময়ের সাথে সাক্ষাতের। কিন্তু হয়ে উঠেনি।তাই, একদিন কল্পনায় সময়ের সঙ্গে দেখা করতে বের হলাম। বহু বছর ধরে আমি তাকে খুঁজেছি ইতিহাসের পাতায়, পুরোনো অ্যালবামে, বৃদ্ধ/বৃদ্ধার কপালের ভাঁজে আর শিশুর প্রথম হাসিতে। কিন্তু কোথাও ধরতে পারিনি। সে ছিল সর্বত্র, অথচ অদৃশ্য।

এক সন্ধ্যায়, অস্তগামী সূর্যের আলো যখন নদীর জলে গলে পড়ছিল, তখন দেখলাম একজন বৃদ্ধ নৌকার ধারে আনমনে বসে আছেন। চোখে তাঁর হাজার বছরের ক্লান্তি, আবার নবজাতক শিশুর মতো নির্মলতা। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কে?”

মৃদু হেসে জবাব, “আমি সময়।”

অবাক হলাম না। যেন অনেক আগে থেকেই জানতাম, একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হবেই। বললাম, “মানুষ আপনাকে এত ভয় পায় কেন?”

সময় নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “কারণ মানুষ আমাকে হারাতে চায়, কিন্তু কেউ পারেনি কোনদিন। রাজা, সম্রাট, কবি, বণিক, বিজ্ঞানী, সবাই ভেবেছিল তাদের নাম চিরকাল থাকবে। অথচ দেখো, কত নাম আজ ধুলোর নিচে হারিয়ে গেছে।”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললাম, “তাহলে মানুষের সব চেষ্টা কি অর্থহীন?”

সময় মাথা নাড়ল। “না,”
সে বলল, “অর্থহীন নয়। মানুষ ভুল করে ভাবে অমরত্ব মানে বেঁচে থাকা। আসলে অমরত্ব মানে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠা। একটি ভালোবাসা, একটি সত্য বাক্য, একটি সৎ কাজ, এগুলো আমার কাছেও সহজে হারিয়ে যায় না।”

তাঁর কথা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, আমার নিজের জীবনের কথা। কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল! অনেক কিছু পূরণ হয়েছে, আবার অনেক কিছু হয়নি। কখনো মনে হয়েছে আমি জিতেছি, আবার কখনো মনে হয়েছে হেরে গেছি।

সময় যেন আমার মনের কথা পড়ে ফেলল।

“জয় আর পরাজয়,” সে বলল, “এ দুটোই মানুষের ভাষা। আমার ভাষায় মানুষের শুধু যাত্রা আছে। যে মানুষ পথ চলতে শিখেছে, সে কখনো পুরোপুরি হারেনি।”

আকাশ তখন অন্ধকার হয়ে আসছে। দূরের গ্রামে একে একে আলো জ্বলছে। আমি দেখলাম বৃদ্ধের মুখটাও ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তাড়াতাড়ি বললাম, “একটি উপদেশ দিন।”

সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“মানুষ ভবিষ্যতের জন্য এত দৌঁড়ায় যে বর্তমানকে হারিয়ে ফেলে। আবার অতীতের জন্য এত কাঁদে যে বর্তমানকে চিনতেও পারে না। অথচ আমি শুধু বর্তমানের মধ্যেই বাস করি। যে আজকে ভালোভাবে বাঁচতে পারে, সে-ই আমাকে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে।”

আমি আর কিছু বলার আগেই বৃদ্ধটি মিলিয়ে গেলেন। শুধু নদীর জল বয়ে চলল, বাতাস বইতে থাকল, আর দূরে রাতের প্রথম তারা জ্বলে উঠল।

সেদিন বাড়ি ফিরে আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসেছিলাম। অনেক গল্প লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি বাক্যই লিখলাম—

“মানুষ সময়কে মাপতে শিখেছে, কিন্তু সময়ের ভেতর বাঁচতে শেখাই তার সবচেয়ে বড় সাধনা।”

Mohammed Shahid Ullah

Mohammed Shahid Ullah, FCA is a senior finance and banking professional with over 30 years of experience across commercial banking, insurance, and non-government organizations. He currently serves as Deputy Managing Director (DMD) and Chief Financial Officer (CFO) of a leading commercial bank in Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button