গ্রামের পুরোনো প্রাইমারি স্কুলটির সামনে আজ এক অদ্ভুত দৃশ্য। বহু বছর পর কয়েকজন মধ্যবয়সী মানুষ আবার জড়ো হয়েছে সেই মাটির মাঠে, যেখানে তাদের শৈশবের স্বপ্নগুলো প্রথম ডানা মেলেছিল। স্কুলের বারান্দায় বসে আছেন তাদের প্রিয় শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদের স্যার।
স্যারের চুল সাদা হয়ে গেছে, চোখে মোটা চশমা। তবুও কণ্ঠে সেই আগের দৃঢ়তা।
রফিক, জামাল, করিম সবাই একে একে এগিয়ে এসে সালাম দিল।
—“স্যার, চিনতে পারছেন?”
স্যার মৃদু হেসে বললেন,
—“তোমাদের কি ভোলা যায়? তোমরা তো আমার গর্ব।”
একটু নীরবতার পর রফিক বলল,
—“স্যার, মনে আছে? ১৯৭৫ থেকে ৮২ সালের সেই সময়গুলো… প্রতিদিন সকালে আমরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইতাম, তারপর শপথ নিতাম—দেশকে ভালোবাসবো, সৎ থাকবো।”
স্যারের চোখে জল চিকচিক করে উঠল।
—“হ্যাঁ, তখন আমরা শিখতাম মানুষ হওয়ার শিক্ষা… শুধু পাস করার জন্য না, ভালো মানুষ হওয়ার জন্য।”
জামাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“স্যার, এখন আর সেই মাঠটাই নেই। জায়গাটা দখল হয়ে গেছে। জাতীয় সংগীতও এখন অনেক জায়গায় শুধু ‘অপশনাল’। শপথ নেওয়ার কথা তো কেউ বলেই না।”
করিম যোগ করল,
—“এখন ছাত্ররা বলে, ‘স্যার এত বকা দেন কেন?’ ‘শিক্ষক কি সব জানেন?’ এমনকি বেত্রাঘাত তো এখন অপরাধ। কিন্তু শৃঙ্খলা শেখানোর আর কোনো উপায়ও যেন নেই।”
স্যার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
—“বেত্রাঘাত কখনোই মূল বিষয় ছিল না। মূল বিষয় ছিল শাসনের আড়ালে ভালোবাসা। আমরা চাইতাম তোমরা যেন ভুল পথে না যাও।”
রফিক কিছুটা আবেগ নিয়ে বলল,
—“স্যার, এখন সবাই বলে, মানুষ হওয়া নয়, বড়লোক হওয়া জরুরি। যার বেশি টাকা, সেই বড়। জ্ঞানী মানুষের কদর কমে গেছে।”
স্যার গভীরভাবে তাকালেন সবার দিকে।
—“টাকা জীবনের প্রয়োজন, কিন্তু লক্ষ্য নয়। আমরা তো শিখিয়েছিলাম, দেশপ্রেম, সততা, মানবতা এইগুলোই মানুষের আসল পরিচয়।”
জামাল বলল,
—“স্যার, এখন পিছনের বেঞ্চে বসা ছাত্ররাও পড়াশোনার চেয়ে রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত।”
স্যার একটু হেসে বললেন,
—“রাজনীতি খারাপ নয়, কিন্তু সময়ের আগে কিছুই ভালো না। শিকড় শক্ত না হলে গাছ টিকে না।”
কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল। বাতাসে ভেসে এলো দূরের আজানের ধ্বনি।
স্যার আবার বললেন—
—“তোমরা কি মনে করো, সব শেষ হয়ে গেছে?”
সবাই একসাথে মাথা নাড়ল, “না স্যার…”
স্যার বললেন,
—“তাহলে শুরু করো। পরিবর্তন সবসময় নিজের থেকেই শুরু হয়।”
তোমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে। দেশপ্রেম বাড়ানোর জন্য তোমাদের করণীয় হওয়া উচিত:
১. প্রাথমিক স্তরে মূল্যবোধ শিক্ষা জোরদার করা
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দেশপ্রেম, সততা ও মানবতার শিক্ষা দিতে হবে, শুধু বইয়ে নয়, বাস্তব অনুশীলনে।
২. জাতীয় সংগীত ও শপথ পুনরায় বাধ্যতামূলক করা
প্রতিদিনের চর্চা শিশুদের মনে দায়িত্ববোধ তৈরি করে।
৩. খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ
মাঠ শুধু খেলার জায়গা নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের কেন্দ্র।
৪. শিক্ষকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা
শিক্ষককে শুধু জ্ঞানদাতা নয়, পথপ্রদর্শক হিসেবে সম্মান দিতে হবে।
৫. টাকার চেয়ে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া
শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও মানবিকতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৬. ছাত্রদের রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করা
শিক্ষার সময় শিক্ষা, পরিণত বয়সে দায়িত্ব এই ভারসাম্য জরুরি।
৭. পরিবারের ভূমিকা জোরদার করা
দেশপ্রেমের প্রথম পাঠ পরিবার থেকেই শুরু হয়।
যে যখানে আছ, সেখান থেকেই শুরু কর, অনেক সাথী পাবে তোমরা।
গল্পের শেষে স্যার ধীরে ধীরে জাতীয় সংগীতের প্রথম লাইনটি গুনগুন করে উঠলেন।
“আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি।”
তার ছাত্ররাও একে একে কণ্ঠ মিলাল…
মাঠ নেই, তবুও সেই সকাল যেন আবার ফিরে এলো—
“শপথের সেই সকাল।”